Showing posts with label কাজী নজরুল ইসলাম. Show all posts
Showing posts with label কাজী নজরুল ইসলাম. Show all posts

Tuesday, May 3, 2016

ঈশ্বর

_____কাজী নজরুল ইসলাম
কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে’
কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?
       হায় ঋষি দরবেশ,
  বুকের মানিকে বুকে ধ’রে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।
  সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে,
  স্রষ্টারে খোঁজো-আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!
  ইচ্ছা-অন্ধ! আঁখি খোলো, দেশ দর্পণে নিজ-কায়া,
  দেখিবে, তোমারি সব অবয়বে প’ড়েছে তাঁহার ছায়া।
  শিহরি’ উঠো না, শাস্ত্রবিদের ক’রো না ক’ বীর, ভয়-
তাহারা খোদার খোদ্‌ ‘প্রাইভেট সেক্রেটারী’ ত নয়!
সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি!
আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি!
রত্ন লইয়া বেচা-কেনা করে বণিক সিন্ধু-কুলে-
রত্নাকরের খবর তা ব’লে পুছো না ওদের ভুলে’।
   উহারা রত্ন-বেনে,
রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্নাকরেও চেনে!
ডুবে নাই তা’রা অতল গভীর রত্ন-সিন্ধুতলে,
শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও, সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।


Tuesday, March 22, 2016

মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দ্যম

_____কাজী নজরুল ইসলাম
মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দ্যম 
মোরা ঝর্ণার মত চঞ্চল, 
মোরা বিধাতার মত নির্ভয় 
মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল।। 
মোরা আকাশের মত বাঁধাহীন 
মোরা মরু সঞ্চার বেদুঈন, 
বন্ধনহীন জন্ম স্বাধীন 
চিত্তমুক্ত শতদল।। 
মোরা সিন্ধু জোঁয়ার কলকল 
মোরা পাগলা জোঁয়ার ঝরঝর। 
কল-কল-কল, ছল-ছল-ছল 
মোরা দিল খোলা খোলা প্রান্তর, 
মোরা শক্তি অটল মহীধর। 
হাসি গান শ্যাম উচ্ছল 
বৃষ্টির জল বনফল খাই- 
শয্যা শ্যামল বনতল।।

হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক

____কাজী নজরুল ইসলাম
হিন্দু-মুসলিম দুটি ভাই
ভারতের দুই আঁখি তারা
এক বাগানে দুটি তরু দেবদারু আর কদম চারা।।

যেন গঙ্গা সিন্ধু নদী
যায় গো বয়ে নিরবধি
এক হিমালয় হতে আসে, এক সাগরে হয় গো হারা।।

বুলবুল আর কোকিল পাখী
এক কাননে যায় গো ডাকি,
ভাগীরথী যমুনা বয় মায়ের চোখের যুগল ধারা।।

ঝগড়া করে ভায়ে ভায়ে
এক জননীর কোল লয়ে
মধুর যে এ কলহ ভাই পিঠোপিঠী ভায়ের পারা।।

পেটে ধরা ছেলের চেয়ে চোখে ধরারা মায়া বেশী,
অতিথী ছিল অতীতে, আজ সে সখা প্রতিবেশী।
ফুল পাতিয়ে গোলাপ বেলী
একই মায়ের বুকে খেলি,
পাগলা তা'রা আল্লা ভগবানে ভাবে ভিন্ন যারা।।

সাম্যবাদী

_____ কাজী নজরুল ইসলাম
গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্‌লিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!
কে তুমি?- পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
কন্‌ফুসিয়াস্‌? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!
বন্ধু, যা-খুশি হও,
পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-
জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, যত সখ-
কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
দোকানে কেন এ দর কষাকষি? -পথে ফুটে তাজা ফুল!
তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
তোমার হৃষয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার।
কেন খুঁজে ফের’ দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি -কঙ্কালে?
হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!

বন্ধু, বলিনি ঝুট,
এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
এই হৃদ্য়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম্‌ এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
মস্‌জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
এইখানে ব’সে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,
এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহবান,
এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।

Saturday, August 15, 2015

আমাদের নারী

আমাদের নারী

গুনে গরিমায় আমাদের নারী আদর্শ দুনিয়ায়। 
রূপে লাবন্যে মাধুরী ও শ্রীতে হুরী পরী লাজ পায়।। 
নর নহে, নারী ইসলাম পরে প্রথম আনে ঈমান, 
আম্মা খাদিজা জগতে সর্ব-প্রথম মুসলমান, 
পুরুষের সব গৌরবস্নান এক এই  মহিমায়।। 
নবী নন্দিনী ফাতেমা মোদের সতী নারীদের রাণী, 
যাঁর ত্যাগ সেবা স্নেহ ছিল মরূভুমে কওসর পানি, 
যাঁর গুণ-গাথা ঘরে ঘরে প্রতি  নর-নারী আজো গায়।। 
রহিমার মত মহিমা কাহার, তাঁর সম সতী কেবা, 
নারী নয় যেন মূর্তি ধরিয়া এসেছিল পতি সেবা 
মোদের খাওয়ালা জগতের আলা বীরত্বে গরিমায়।। 
রাজ্য শাসনের রিজিয়ার নাম ইতিহাসে অক্ষয়, 
শৌর্যে সাহসে চাঁদ সুলতানা বিশ্বের বিস্ময়। 
জেবুন্নেসার তুলনায় কোথায় জ্ঞানের তাপস্যার।। 
বারো বছরের বালিকা লায়লা ওহাবীব দলপতি 
মোদের সাকিনা জাহানারা যেন ধৈর্য মূর্তিমতী, 
সে গৌরবের গোর হয়ে গেছে আঁধারের বোরকায়।। 
আঁধার হেরেমে বন্দিনী হলো সহসা আলোর মেয়ে, 
সেই দিন হতে ইসলাম গেল গ্লানির কালিতে ছেয়ে 
লক্ষ খালিদা আসিবে, যদি এ নারীরা মুক্তি পায়।।

আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে– 
মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে। 

আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে - 
বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার – ভাঙা কল্লোলে। 
আসল হাসি, আসল কাঁদন 
মুক্তি এলো, আসল বাঁধন, 
মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মোর তিক্ত দুখের সুখ আসে। 
ঐ রিক্ত বুকের দুখ আসে - 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে! 

আসল উদাস, শ্বসল হুতাশ 
সৃষ্টি-ছাড়া বুক-ফাটা শ্বাস, 
ফুললো সাগর দুললো আকাশ ছুটলো বাতাস, 
গগন ফেটে চক্র ছোটে, পিণাক-পাণির শূল আসে! 
ঐ ধূমকেতু আর উল্কাতে 
চায় সৃষ্টিটাকে উল্টাতে, 

আজ তাই দেখি আর বক্ষে আমার লক্ষ বাগের ফুল হাসে 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে! 
আজ হাসল আগুন, শ্বসল ফাগুন, 
মদন মারে খুন-মাখা তূণ 
পলাশ অশোক শিমুল ঘায়েল 
ফাগ লাগে ঐ দিক-বাসে 
গো দিগ বালিকার পীতবাসে; 

আজ রঙ্গন এলো রক্তপ্রাণের অঙ্গনে মোর চারপাশে 
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে! 
আজ কপট কোপের তূণ ধরি, 
ঐ আসল যত সুন্দরী, 
কারুর পায়ে বুক ডলা খুন, কেউ বা আগুন, 
কেউ মানিনী চোখের জলে বুক ভাসে! 
তাদের প্রাণের ‘বুক-ফাটে-তাও-মুখ-ফোটে-না’ বাণীর বীণা মোর পাশে 
ঐ তাদের কথা শোনাই তাদের 
আমার চোখে জল আসে 
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে! 

আজ আসল ঊষা, সন্ধ্যা, দুপুর, 
আসল নিকট, আসল সুদূর 
আসল বাধা-বন্ধ-হারা ছন্দ-মাতন 
পাগলা-গাজন-উচ্ছ্বাসে! 
ঐ আসল আশিন শিউলি শিথিল 
হাসল শিশির দুবঘাসে 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে! 

আজ জাগল সাগর, হাসল মরু 
কাঁপল ভূধর, কানন তরু 
বিশ্ব-ডুবান আসল তুফান, উছলে উজান 
ভৈরবীদের গান ভাসে, 
মোর ডাইনে শিশু সদ্যোজাত জরায়-মরা বামপাশে। 

মন ছুটছে গো আজ বল্গাহারা অশ্ব যেন পাগলা সে। 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে! 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!!

বিদায়-বেলায়

বিদায়-বেলায়

তুমি অমন ক’রে গো বারে বারে জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না, 
জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না। 
ঐ কাতর কন্ঠে থেকে থেকে শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না, 
শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না।। 
হাসি দিয়ে যদি লুকালে তোমার সারা জীবনের বেদনা, 
আজো তবে শুধু হেসে যাও, আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না। 
ঐ ব্যথাতুর আঁখি কাঁদো-কাঁদো মুখ 
দেখি আর শুধু হেসে যাও,আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না। 
চলার তোমার বাকী পথটুকু- 
পথিক! ওগো সুদূর পথের পথিক- 
হায়, অমন ক’রে ও অকর”ণ গীতে আঁখির সলিলে ছেয়ো না, 
ওগো আঁখির সলিলে ছেয়ো না।। 

দূরের পথিক! তুমি ভাব বুঝি 
তব ব্যথা কেউ বোঝে না, 
তোমার ব্যথার তুমিই দরদী একাকী, 
পথে ফেরে যারা পথ-হারা, 
কোন গৃহবাসী তারে খোঁজে না, 
বুকে ক্ষত হ’য়ে জাগে আজো সেই ব্যথা-লেখা কি? 
দূর বাউলের গানে ব্যথা হানে বুঝি শুধু ধূ-ধূ মাঠে পথিকে? 
এ যে মিছে অভিমান পরবাসী! দেখে ঘর-বাসীদের ক্ষতিকে! 
তবে জান কি তোমার বিদায়- কথায় 
কত বুক-ভাঙা গোপন ব্যথায় 
আজ কতগুলি প্রাণ কাঁদিছে কোথায়- 
পথিক! ওগো অভিমানী দূর পথিক! 
কেহ ভালোবাসিল না ভেবে যেন আজো 
মিছে ব্যথা পেয়ে যেয়ো না, 
ওগো যাবে যাও, তুমি বুকে ব্যথা নিয়ে যেয়ো না।।

দারিদ্র্য

দারিদ্র্য

হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান্‌। 
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান 
কন্টক-মুকুট শোভা।-দিয়াছ, তাপস, 
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস; 
উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি, বাণী ক্ষুরধার, 
বীণা মোর শাপে তব হ’ল তরবার! 
দুঃসহ দাহনে তব হে দর্পী তাপস, 
অম্লান স্বর্ণেরে মোর করিলে বিরস, 
অকালে শুকালে মোর রূপ রস প্রাণ! 
শীর্ণ করপুট ভরি’ সুন্দরের দান 
যতবার নিতে যাই-হে বুভুক্ষু তুমি 
অগ্রে আসি’ কর পান! শূন্য মরুভূমি 
হেরি মম কল্পলোক। আমার নয়ন 
আমারি সুন্দরে করে অগ্নি বরিষণ! 

বেদনা-হলুদ-বৃন্ত কামনা আমার 
শেফালির মত শুভ্র সুরভি-বিথার 
বিকশি’ উঠিতে চাহে, তুমি হে নির্মম, 
দলবৃন্ত ভাঙ শাখা কাঠুরিয়া সম! 
আশ্বিনের প্রভাতের মত ছলছল 
ক’রে ওঠে সারা হিয়া, শিশির সজল 

টলটল ধরণীর মত করুণায়! 
তুমি রবি, তব তাপে শুকাইয়া যায় 
করুণা-নীহার-বিন্দু! ম্লান হ’য়ে উঠি 
ধরণীর ছায়াঞ্চলে! স্বপ্ন যায় টুটি’ 
সুন্দরের, কল্যাণের। তরল গরল 
কন্ঠে ঢালি’ তুমি বল, ‘অমৃতে কি ফল? 
জ্বালা নাই, নেশা নাই. নাই উন্মাদনা,- 
রে দুর্বল, অমরার অমৃত-সাধনা 
এ দুঃখের পৃথিবীতে তোর ব্রত নহে, 
তুই নাগ, জন্ম তোর বেদনার দহে। 
কাঁটা-কুঞ্জে বসি’ তুই গাঁথিবি মালিকা, 
দিয়া গেনু ভালে তোর বেদনার টিকা!…. 
গাহি গান, গাঁথি মালা, কন্ঠ করে জ্বালা, 
দংশিল সর্বাঙ্গে মোর নাগ-নাগবালা!…. 

ভিক্ষা-ঝুলি নিয়া ফের’ দ্বারে দ্বারে ঋষি 
ক্ষমাহীন হে দুর্বাসা! যাপিতেছে নিশি 
সুখে রব-বধূ যথা-সেখানে কখন, 
হে কঠোর-কন্ঠ, গিয়া ডাক-‘মূঢ়, শোন্‌, 
ধরণী বিলাস-কুঞ্জ নহে নহে কারো, 
অভাব বিরহ আছে, আছে দুঃখ আরো, 
আছে কাঁটা শয্যাতলে বাহুতে প্রিয়ার, 
তাই এবে কর্‌ ভোগ!-পড়ে হাহাকার 
নিমেষে সে সুখ-স্বর্গে, নিবে যায় বাতি, 
কাটিতে চাহে না যেন আর কাল-রাতি! 
চল-পথে অনশন-ক্লিষ্ট ক্ষীণ তনু, 
কী দেখি’ বাঁকিয়া ওঠে সহসা ভ্রূ-ধনু, 
দু’নয়ন ভরি’ রুদ্র হানো অগ্নি-বাণ, 
আসে রাজ্যে মহামারী দুর্ভিক্ষ তুফান, 
প্রমোদ-কানন পুড়ে, উড়ে অট্টালিকা,- 
তোমার আইনে শুধু মৃত্যু-দন্ড লিখা! 

বিনয়ের ব্যভিচার নাহি তব পাশ, 
তুমি চান নগ্নতার উলঙ্গ প্রকাশ। 
সঙ্কোচ শরম বলি’ জান না ক’ কিছু, 
উন্নত করিছ শির যার মাথা নীচু। 
মৃত্যু-পথ-যাত্রীদল তোমার ইঙ্গিতে 
গলায় পরিছে ফাঁসি হাসিতে হাসিতে! 
নিত্য অভাবের কুন্ড জ্বালাইয়া বুকে 
সাধিতেছ মৃত্যু-যজ্ঞ পৈশাচিক সুখে! 
লক্ষ্মীর কিরীটি ধরি, ফেলিতেছ টানি’ 
ধূলিতলে। বীণা-তারে করাঘাত হানি’ 
সারদার, কী সুর বাজাতে চাহ গুণী? 
যত সুর আর্তনাদ হ’য়ে ওঠে শুনি! 
প্রভাতে উঠিয়া কালি শুনিনু, সানাই 
বাজিছে করুণ সুরে! যেন আসে নাই 
আজো কা’রা ঘরে ফিরে! কাঁদিয়া কাঁদিয়া 
ডাকিছে তাদেরে যেন ঘরে ‘সানাইয়া’! 
বধূদের প্রাণ আজ সানা’য়ের সুরে 
ভেসে যায় যথা আজ প্রিয়তম দূরে 
আসি আসি করিতেছে! সখী বলে, ‘বল্‌ 
মুছিলি কেন লা আঁখি, মুছিলি কাজল?…. 

শুনিতেছি আজো আমি প্রাতে উঠিয়াই 
‘ আয় আয়’ কাঁদিতেছে তেমনি সানাই। 
ম্লানমুখী শেফালিকা পড়িতেছে ঝরি’ 
বিধবার হাসি সম-স্নিগ্ধ গন্ধে ভরি’! 
নেচে ফেরে প্রজাপতি চঞ্চল পাখায় 
দুরন্ত নেশায় আজি, পুষ্প-প্রগল্‌ভায় 
চুম্বনে বিবশ করি’! ভোমোরার পাখা 
পরাগে হলুদ আজি, অঙ্গে মধু মাখা। 

উছলি’ উঠিছে যেন দিকে দিকে প্রাণ! 
আপনার অগোচরে গেয়ে উঠি গান 
আগমনী আনন্দের! অকারণে আঁখি 
পু’রে আসে অশ্রু-জলে! মিলনের রাখী 
কে যেন বাঁধিয়া দেয় ধরণীর সাথে! 
পুষ্পঞ্জলি ভরি’ দু’টি মাটি মাখা হাতে 
ধরণী এগিয়ে আসে, দেয় উপহার। 
ও যেন কনিষ্ঠা মেয়ে দুলালী আমার!- 
সহসা চমকি’ উঠি! হায় মোর শিশু 
জাগিয়া কাঁদিছ ঘরে, খাওনি ক’ কিছু 
কালি হ’তে সারাদিন তাপস নিষ্ঠুর, 
কাঁদ’ মোর ঘরে নিত্য তুমি ক্ষুধাতুর! 

পারি নাই বাছা মোর, হে প্রিয় আমার, 
দুই বিন্দু দুগ্ধ দিতে!-মোর অধিকার 
আনন্দের নাহি নাহি! দারিদ্র্য অসহ 
পুত্র হ’য়ে জায়া হয়ে কাঁদে অহরহ 
আমার দুয়ার ধরি! কে বাজাবে বাঁশি? 
কোথা পাব আনন্দিত সুন্দরের হাসি? 
কোথা পাব পুষ্পাসব?-ধুতুরা-গেলাস 
ভরিয়া করেছি পান নয়ন-নির্যাস!…. 
আজো শুনি আগমনী গাহিছে সানাই, 
ও যেন কাঁদিছে শুধু-নাই কিছু নাই!

অ-নামিকা

অ-নামিকা

তোমারে বন্দনা করি 
স্বপ্ন-সহচরী 
লো আমার অনাগত প্রিয়া, 
আমার পাওয়ার বুকে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া! 
তোমারে বন্দনা করি…. 
হে আমার মানস-রঙ্গিণী, 
অনন্ত-যৌবনা বালা, চিরন্তন বাসনা-সঙ্গিনী! 
তোমারে বন্দনা করি…. 
নাম-নাহি-জানা ওগো আজো-নাহি-আসা! 
আমার বন্দনা লহ, লহ ভালবাসা…. 
গোপণ-চারিণী মোর, লো চির-প্রেয়সী! 
সৃষ্টি-দিন হ’তে কাঁদ’ বাসনার অন্তরালে বসি’- 
ধরা নাহি দিলে দেহে। 
তোমার কল্যাণ-দীপ জ্বলিলে না 
দীপ-নেভা বেড়া-দেওয়া গেহে। 
অসীমা! এলে না তুমি সীমারেখা-পারে! 
স্বপনে পাইয়া তোমা’ স্বপনে হারাই বারে বারে 
অরুপা লো! রহি হ’য়ে এলে মনে, 
সতী হ’য়ে এলে না ক’ ঘরে। 
প্রিয় হ’য়ে এলে প্রেমে, 
বধূ হয়ে এলে না অধরে! 
দ্রাক্ষা-বুকে রহিলে গোপনে তুমি শিরীন্‌ শরাব, 
পেয়ালায় নাহি এলে!- 
‘উতারো নেকার’- 
হাঁকে মোর দুরন্ত কামনা! 
সুদুরিকা! দূরে থাক’-ভালোবাসা-নিকটে এসো না। 

তুমি নহ নিভে যাওয়া আলো, নহ শিখা। 
তুমি মরীচিকা, 
তুমি জ্যোতি।- 
জন্ম-জন্মান্তর ধরি’ লোকে-লোকান্তরে তোমা’ করেছি আরতি, 
বারে বারে একই জন্মে শতবার করি! 
যেখানে দেখেছি রূপ,-করেছি বন্দনা প্রিয়া তোমারেই স্মরি’। 
রূপে রূপে, অপরূপা, খুঁজেছি তোমায়, 
পবনের যবনিকা যত তুলি তত বেড়ে যায়! 
বিরহের কান্না-ধোওয়া তৃপ্ত হিয়া ভরি’ 
বারে বারে উদিয়াছ ইন্দ্রধনুসমা, 
হাওয়া-পরী 
প্রিয় মনোরমা! 
ধরিতে গিয়োছি-তুমি মিলায়েছ দূর দিগ্বলয়ে 
ব্যথা-দেওয়া রাণী মোর, এলে না ক’ কথা কওয়া হ’য়ে। 

চির-দূরে থাকা ওগো চির-নাহি-আসা! 
তোমারে দেহের তীরে পাবার দুরাশা 
গ্রহ হ’তে গ্রহান্তরে ল’য়ে যায় মোরে! 
বাসনার বিপুল আগ্রহে- 
জন্ম লভি লোকে-লোকান্তরে! 
উদ্বেলিত বুকে মোর অতৃপ্ত যৌবন-ক্ষুধা 
উদগ্র কামনা, 
জন্ম তাই লভি বারে বারে, 
না-পাওয়ার করি আরাধনা!…. 
যা-কিছু সুন্দর হেরি’ ক’রেছি চুম্বন, 
যা-কিছু চুম্বন দিয়া ক’রেছি সুন্দর- 
সে-সবার মাঝে যেন তব হরষণ 
অনুভব করিয়াছি!-ছুঁয়েছি অধর 
তিলোত্তমা, তিলে তিলে! 
তোমারে যে করেছি চুম্বন 
প্রতি তরুণীর ঠোঁটে 
প্রকাশ গোপন। 

যে কেহ প্রিয়ারে তার চুম্বিয়াছে ঘুম-ভাঙা রাতে, 
রাত্রি-জাগা তন্দ্রা-লাগা ঘুম-পাওয়া প্রাতে, 
সকলের সাথে আমি চুমিয়াছি তোমা’ 
সকলের ঠোঁটে যেন, হে নিখিল-প্রিয়া প্রিয়তমা! 
তরু, লতা, পশু, পাখী, সকলের কামনার সাথে 
আমার কামনা জাগে,-আমি রমি বিশ্ব-কামনাতে! 
বঞ্চিত যাহারা প্রেমে, ভুঞ্জে যারা রতি- 
সকলের মাঝে আমি-সকলের প্রেমে মোর গতি! 
যে-দিন স্রষ্টার বুকে জেগেছিল আদি সৃষ্টি-কাম, 
সেই দিন স্রষ্টা সাথে তুমি এলে, আমি আসিলাম। 
আমি কাম, তুমি হ’লে রতি, 
তরুণ-তরুণী বুকে নিত্য তাই আমাদের অপরূপ গতি! 
কী যে তুমি, কী যে নহ, কত ভাবি-কত দিকে চাই! 
নামে নামে, অ-নামিকা, তোমারে কি খুঁজিনু বৃথাই? 
বৃথাই বাসিনু ভালো? বৃথা সবে ভালোবাসে মোরে? 
তুমি ভেবে যারে বুকে চেপে ধরি সে-ই যায় স’রে। 
কেন হেন হয়, হায়, কেন লয় মনে- 
যারে ভালো বাসিলাম, তারো চেয়ে ভালো কেহ 
বাসিছে গোপনে। 

সে বুঝি সুন্দরতর-আরো আরো মধু! 
আমারি বধূর বুকে হাসো তুমি হ’য়ে নববধূ। 
বুকে যারে পাই, হায়, 
তারি বুকে তাহারি শয্যায় 
নাহি-পাওয়া হ’য়ে তুমি কাঁদ একাকিনী, 
ওগো মোর প্রিয়ার সতিনী।…. 
বারে বারে পাইলাম-বারে বারে মন যেন কহে- 
নহে, এ সে নহে! 
কুহেলিকা! কোথা তুমি? দেখা পাব কবে? 
জন্মেছিলে জন্মিয়াছ কিম্বা জন্ম লবে? 
কথা কও, কও কথা প্রিয়া, 
হে আমার যুগে-যুগে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া! 

কহিবে না কথা তুমি! আজ মনে হয়, 
প্রেম সত্য চিরন্তন, প্রেমের পাত্র সে বুঝি চিরন্তন নয়। 
জন্ম যার কামনার বীজে 
কামনারই মাঝে সে যে বেড়ে যায় কল্পতরু নিজে। 
দিকে দিকে শাখা তার করে অভিযান, 
ও যেন শুষিয়া নেবে আকাশের যত বায়ু প্রাণ। 
আকাশ ঢেকেছে তার পাখা 
কামনার সবুজ বলাকা! 

প্রেম সত্য, প্রেম-পাত্র বহু-আগণন, 
তাই-চাই, বুকে পাই, তবু কেন কেঁদে ওঠে মন। 
মদ সত্য, পাত্র সত্য নয়! 
যে-পাত্রে ঢালিয়া খাও সেই নেশা হয়! 
চির-সহচরী! 
এতদিনে পরিচয় পেনু, মরি মরি! 
আমারি প্রেমের মাঝে রয়েছ গোপন, 
বৃথা আমি খুঁজে মরি’ জন্মে জন্মে করিনু রোদন। 
প্রতি রূপে, অপরূপা, ডাক তুমি, 
চিনেছি তোমায়, 
যাহারে বাসিব ভালো-সে-ই তুমি, 
ধরা দেবে তায়! 
প্রেম এক, প্রেমিকা সে বহু, 
বহু পাত্রে ঢেলে পি’ব সেই প্রেম- 
সে শরাব লোহু। 
তোমারে করিব পান, অ-নামিকা, শত কামনায়, 
ভৃঙ্গারে, গোলাসে কভু, কভু পেয়ালায়!

অবেলার ডাক

অবেলার ডাক

অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে, 
      আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে।। 
      আজ মনে হয় রোজ রাতে সে ঘুম পাড়াত নয়ন চুমে, 
     চুমুর পরে চুম দিয়ে ফের হান্‌তে আঘাত ভোরের ঘুমে। 
                  ভাব্‌তুম তখন এ কোন্‌ বালাই! 
                   কর্‌ত এ প্রাণ পালাই পালাই। 
      আজ সে কথা মনে হ’য়ে ভাসি অঝোর নয়ন-ঝরে। 
     অভাগিনীর সে গরব আজ ধূলায় লুটায় ব্যথার ভারে।। 
     তরুণ তাহার ভরাট বুকের উপ্‌চে-পড়া আদর সোহাগ 
   হেলায় দু’পায় দ’লেছি মা, আজ কেন হায় তার অনুরাগ? 
                     এই চরণ সে বক্ষে চেপে 
                    চুমেছে, আর দু’চোখ ছেপে 
       জল ঝ’রেছে, তখনো মা কইনি কথা অহঙ্কারে, 
     এম্‌নি দারুণ হতাদরে ক’রেছি মা, বিদায় তারে।। 
   দেখেওছিলাম বুক-ভরা তার অনাদরের আঘাত-কাঁটা, 
      দ্বার হ’তে সে গেছে দ্বারে খেয়ে সবার লাথি-ঝাটা। 
                    ভেবেছিলাম আমার কাছে 
                    তার দরদের শানি- আছে, 
   আমিও গো মা ফিরিয়ে দিলাম চিন্‌তে নেরে দেবতারে। 
       ভিক্ষুবেশে এসেছিল রাজাধিরাজ দাসীর দ্বারে।। 
   পথ ভুলে সে এসেছিল সে মোর সাধের রাজ-ভিখারী, 
    মাগো আমি ভিখারিনী, আমি কি তাঁয় চিন্‌তে পারি? 
                  তাই মাগো তাঁর পূজার ডালা 
                    নিইনি, নিইনি মণির মালা, 
   দেব্‌তা আমার নিজে আমায় পূজল ষোড়শ-উপচারে। 
     পূজারীকে চিন্‌লাম না মা পূজা-ধূমের অন্ধকারে।। 
আমায় চাওয়াই শেষ চাওয়া তার মাগো আমি তা কি জানি? 
       ধরায় শুধু রইল ধরা রাজ-অতিথির বিদায়-বাণী। 
                     ওরে আমার ভালোবাসা! 
                      কোথায় বেঁধেছিলি বাসা 
       যখন আমার রাজা এসে দাঁড়িয়েছিল এই দুয়ারে? 
   নিঃশ্বসিয়া উঠছে ধরা, ‘নেই রে সে নেই, খুঁজিস কারে!’ 
     সে যে পথের চির-পথিক, তার কি সহে ঘরের মায়া? 
       দূর হ’তে মা দূরন-রে ডাকে তাকে পথের ছায়া। 
                     মাঠের পারে বনের মাঝে 
                     চপল তাহার নূপুর বাজে, 
   ফুলের সাথে ফুটে বেড়ায়, মেঘের সাথে যায় পাহাড়ে, 
    ধরা দিয়েও দেয় না ধরা জানি না সে চায় কাহারে? 
   মাগো আমায় শক্তি কোথায় পথ-পাগলে ধ’রে রাখার? 
    তার তরে নয় ভালোবাসা সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ডাকার। 
                   তাই মা আমার বুকের কবাট 
                   খুলতে নারল তার করাঘাত, 
    এ মন তখন কেমন যেন বাসত ভালো আর কাহারে, 
      আমিই দূরে ঠেলে দিলাম অভিমানী ঘর-হারারে।। 
     সোহাগে সে ধ’রতে যেত নিবিড় ক’রে বক্ষে চেপে, 
     হতভাগী পারিয়ে যেতাম ভয়ে এ বুক উঠ্‌ত কেঁপে। 
                    রাজ ভিখারীর আঁখির কালো, 
                    দূরে থেকেই লাগ্‌ত ভালো, 
   আসলে কাছে ক্ষুধিত তার দীঘল চাওয়া অশ্র”-ভারে। 
  ব্যথায় কেমন মুষড়ে যেতাম, সুর হারাতাম মনে তরে।। 
   আজ কেন মা তারই মতন আমারো এই বুকের ক্ষুধা 
   চায় শুধু সেই হেলায় হারা আদর-সোহাগ পরশ-সুধা, 
                   আজ মনে হয় তাঁর সে বুকে 
                    এ মুখ চেপে নিবিড় সুখে 
  গভীর দুখের কাঁদন কেঁদে শেষ ক’রে দিই এ আমারে! 
যায় না কি মা আমার কাঁদন তাঁহার দেশের কানন-পারে? 
   আজ বুঝেছি এ-জনমের আমার নিখিল শানি–আরাম 
  চুরি ক’রে পালিয়ে গেছে চোরের রাজা সেই প্রাণারাম। 
                  হে বসনে-র রাজা আমার! 
               নাও এসে মোর হার-মানা-হারা! 
   আজ যে আমার বুক ফেটে যায় আর্তনাদের হাহাকারে, 
দেখে যাও আজ সেই পাষাণী কেমন ক’রে কাঁদতে পারে! 
    তোমার কথাই সত্য হ’ল পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে, 
     দাবাললের দার”ণ দাহ তুষার-গিরি আজকে দহে। 
                    জাগল বুকে ভীষণ জোয়ার, 
                    ভাঙল আগল ভাঙল দুয়ার 
    মূকের বুকে দেব্‌তা এলেন মুখর মুখে ভীম পাথারে। 
    বুক ফেটেছে মুখ ফুটেছে-মাগো মানা ক’র্‌ছ কারে? 
     স্বর্গ আমার গেছে পুড়ে তারই চ’লে যাওয়ার সাথে, 
  এখন আমার একার বাসার দোসরহীন এই দুঃখ-রাতে। 
                   ঘুম ভাঙাতে আস্‌বে না সে 
                 ভোর না হ’তেই শিয়র-পাশে, 
     আস্‌বে না আর গভীর রাতে চুম-চুরির অভিসারে, 
    কাঁদাবে ফিরে তাঁহার সাথী ঝড়ের রাতি বনের পারে। 
  আজ পেলে তাঁয় হুম্‌ড়ি খেয়ে প’ড়তুম মাগো যুগল পদে, 
    বুকে ধ’রে পদ-কোকনদ স্নান করাতাম আঁখির হ্রদে। 
                  ব’সতে দিতাম আধেক আঁচল, 
                  সজল চোখের চোখ-ভরা জল- 
    ভেজা কাজল মুছতাম তার চোখে মুখে অধর-ধারে, 
    আকুল কেশে পা মুছাতাম বেঁধে বাহুর কারাগারে। 
    দেখ্‌তে মাগো তখন তোমার রাক্ষুসী এই সর্বনাশী, 
   মুখ থুয়ে তাঁর উদার বুকে ব’লত,‘ আমি ভালোবাসি!’ 
                    ব’ল্‌তে গিয়ে সুখ-শরমে 
                  লাল হ’য়ে গাল উঠত ঘেমে, 
  বুক হ’তে মুখ আস্‌ত নেমে লুটিয়ে যখন কোল-কিনারে, 
দেখ্‌তুম মাগো তখন কেমন মান ক’রে সে থাক্‌তে পারে! 
    এম্‌নি এখন কতই আমা ভালোবাসার তৃষ্ণা জাগে 
    তাঁর ওপর মা অভিমানে, ব্যাথায়, রাগে, অনুরাগে। 
                   চোখের জলের ঋণী ক’রে, 
                   সে গেছে কোন্‌ দ্বীপান-রে? 
     সে বুঝি মা সাত সমুদ্দুর তের নদীর সুদূরপারে? 
  ঝড়ের হাওয়া সেও বুঝি মা সে দূর-দেশে যেতে নারে? 
    তারে আমি ভালোবাসি সে যদি তা পায় মা খবর, 
  চৌচির হ’য়ে প’ড়বে ফেটে আনন্দে মা তাহার কবর। 
                 চীৎকারে তার উঠবে কেঁপে 
                  ধরার সাগর অশ্রু ছেপে, 
     উঠবে ক্ষেপে অগ্নি-গিরি সেই পাগলের হুহুঙ্কারে, 
  ভূধর সাগর আকাশ বাতাস ঘুর্ণি নেচে ঘিরবে তারে। 
  ছি, মা! তুমি ডুকরে কেন উঠছ কেঁদে অমন ক’রে? 
তার চেয়ে মা তারই কোনো শোনা-কথা শুনাও মোরে! 
                শুনতে শুনতে তোমার কোলে 
                 ঘুমিয়ে পড়ি। - ও কে খোলে 
   দুয়ার ওমা? ঝড় বুঝি মা তারই মতো ধাক্কা মারে? 
ঝোড়ো হওয়া! ঝোড়ো হাওয়া! বন্ধু তোমার সাগর পারে! 
   সে কি হেথায় আসতে পারে আমি যেথায় আছি বেঁচে, 
  যে দেশে নেই আমার ছায়া এবার সে সেই দেশে গেছে! 
                    তবু কেন থাকি’ থাকি’, 
                    ইচ্ছা করে তারেই ডাকি! 
   যে কথা মোর রইল বাকী হায় সে কথা শুনাই কারে? 
  মাগো আমার প্রাণের কাঁদন আছড়ে মরে বুকের দ্বারে! 
   যাই তবে মা! দেখা হ’লে আমার কথা ব’লো তারে- 
   রাজার পূজা-সে কি কভু ভিখারিনী ঠেলতে পারে? 
                   মাগো আমি জানি জানি, 
                   আসবে আবার অভিমানী 
  খুঁজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে, 
    ব’লো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!

Monday, February 16, 2015

গোপন প্রিয়া

___ কাজী নজরুল ইসলাম।।।
পাইনি ব’লে আজো তোমায় বাসছি ভালো, রাণি,
মধ্যে সাগর, এ-পার ও-পার করছি কানাকানি!
আমি এ-পার, তুমি ও-পার,
মধ্যে কাঁদে বাধার পাথার
ও-পার হ’তে ছায়া-তরু দাও তুমি হাত্‌ছানি,
আমি মরু, পাইনে তোমার ছায়ার ছোঁওয়াখানি।
নাম-শোনা দুই বন্ধু মোরা, হয়নি পরিচয়!
আমার বুকে কাঁদছে আশা, তোমার বুকে ভয়!
এই-পারী ঢেউ বাদল-বায়ে
আছড়ে পড়ে তোমার পায়ে,
আমার ঢেউ-এর দোলায় তোমার ক’রলো না কূল ক্ষয়,
কূল ভেঙেছে আমার ধারে-তোমার ধারে নয়!
চেনার বন্ধু, পেলাম না ক’ জানার অবসর।
গানের পাখী ব’সেছিলাম দু’দিন শাখার’ পর।
গান ফুরালো যাব যবে
গানের কথাই মনে রবে,
পাখী তখন থাকবো না ক’-থাকবে পাখীর ঘর,
উড়ব আমি,-কাঁদবে তুমি ব্যথার বালুচর!
তোমার পারে বাজল কখন আমার পারের ঢেউ,
অজানিতা! কেউ জানে না, জানবে না ক’ কেউ।
উড়তে গিয়ে পাখা হ’তে
একটি পালক প’ড়লে পথে
ভুলে’ প্রিয় তুলে যেন খোঁপায় গুঁজে নেও!
ভয় কি সখি? আপনি তুমি ফেলবে খুলে এ-ও!
বর্ষা-ঝরা এমনি প্রাতে আমার মত কি
ঝুরবে তুমি একলা মনে, বনের কেতকী?
মনের মনে নিশীথ-রাতে
চুমু দেবে কি কল্পনাতে?
স্বপ্ন দেখে উঠবে জেগে, ভাববে কত কি!
মেঘের সাথে কাঁদবে তুমি, আমার চাতকী!
দূরের প্রিয়া! পাইনি তোমায় তাই এ কাঁদন-রোল!
কূল মেলে না,-তাই দরিয়ায় উঠতেছে ঢেউ-দোল!
তোমায় পেলে থামত বাঁশী,
আসত মরণ সর্বনাশী।
পাইনি ক’ তাই ভ’রে আছে আমার বুকের কোল।
বেণুর হিয়া শূন্য ব’লে উঠবে বাঁশীর বোল।
বন্ধু, তুমি হাতের-কাছের সাথের-সাথী নও,
দূরে যত রও এ হিয়ার তত নিকট হও।
থাকবে তুমি ছায়ার সাথে
মায়ার মত চাঁদনী রাতে!
যত গোপন তত মধুর-নাই বা কথা কও!
শয়ন-সাথে রও না তুমি নয়ন-পাতে রও!
ওগো আমার আড়াল-থাকা ওগো স্বপন-চোর!
তুমি আছ আমি আছি এই তো খুশি মোর।
কোথায় আছ কেমনে রাণি
কাজ কি খোঁজে, নাই বা জানি!
ভালোবাসি এই আনন্দে আপনি আছি ভোর!
চাই না জাগা, থাকুক চোখে এমনি ঘুমের ঘোর!
রাত্রে যখন এক্‌লা শোব-চাইবে তোমার বুক,
নিবিড়-ঘন হবে যখন একলা থাকার দুখ,
দুখের সুরায় মস্ত্‌ হ’য়ে
থাকবে এ-প্রাণ তোমায় ল’য়ে,
কল্পনাতে আঁকব তোমার চাঁদ-চুয়ানো মুখ!
ঘুমে জাগায় জড়িয়ে র’বে, সেই তো চরম সুখ!
গাইব আমি, দূরের থেকে শুনবে তুমি গান।
থামবে আমি-গান গাওয়াবে তোমার অভিমান!
শিল্পী আমি, আমি কবি,
তুমি আমার আঁকা ছবি,
আমার লেখা কাব্য তুমি, আমার রচা গান।
চাইব না ক’, পরান ভ’রে ক’রে যাব দান।
তোমার বুকে স্থান কোথা গো এ দূর-বিরহীর,
কাজ কি জেনে?- তল কেবা পায় অতল জলধির।
গোপন তুমি আসলে নেমে
কাব্যে আমার, আমার প্রেমে,
এই-সে সুখে থাকবে বেঁচে, কাজ কি দেখে তীর?
দূরের পাখী-গান গেয়ে যাই, না-ই বাঁধিলাম নীড়!
বিদায় যেদিন নেবো সেদিন নাই-বা পেলাম দান,
মনে আমায় ক’রবে না ক’-সেই তো মনে স্থান!
যে-দিন আমায় ভুলতে গিয়ে
করবে মনে, সে-দিন প্রিয়ে
ভোলার মাঝে উঠবে বেঁচে, সেই তো আমার প্রাণ!
নাই বা পেলাম, চেয়ে গেলাম, গেলে গেলাম গান!

Sunday, February 15, 2015

পলাতকা

___কাজী নজরুল ইসলাম
কোন্‌ সুদূরের চেনা বাঁশীর ডাক শুনেছিস্‌ ওরে চখা?
ওরে আমার পলাতকা!
তোর প’ড়লো মনে কোন্‌ হারা-ঘর,
স্বপন-পারের কোন্‌ অলকা?
ওরে আমার পলাতকা!
তোর জল ভ’রেছে চপল চোখে,
বল্‌ কোন্‌ হারা-মা ডাকলো তোকে রে?
ঐ গগন-সীমায় সাঁঝের ছায়ায়
হাতছানি দেয় নিবিড় মায়ায়-
উতল পাগল! চিনিস্‌ কি তুই চিনিস্‌ ওকে রে?
যেন বুক-ভরা ও গভীর স্নেহে ডাক দিয়ে যায়, “আয়,
ওরে আয় আয় আয়,
কেবল আয় যে আমার দুষ্টু খোকা!
ওরে আমার পলাতকা!’’
দখিন্‌ হাওয়ায় বনের কাঁপনে-
দুলাল আমার! হাত-ইশারায় মা কি রে তোর
ডাক দিয়েছে আজ?
এতকদিনে চিন্‌লি কি রে পর ও আপনে!
নিশিভোরেই তাই কি আমার নামলো ঘরে সাঁঝ!
ধানের শীষে, শ্যামার শিসে-
যাদুমণি! বল্‌ সে কিসে রে,
তুই শিউরে চেয়ে ছিঁড়লি বাঁধন!
চোখ-ভরা তোর উছলে কাঁদন রে!
তোরে কে পিয়ালো সবুজ স্নেহের কাঁচা বিষে রে!
যেন আচম্‌কা কোন্‌ শশক-শিশু চ’ম্‌কে ডাকে হায়,
“ওরে আয় আয় আয়
আয় রে খোকন আয়,
বনে আয় ফিরে আয় বনের চখা!
ওরে চপল পলাতকা’’।।

কবি-রাণী

___কাজী নজরুল ইসলাম
তুমি আমায় ভালোবাসো তাই তো আমি কবি।
আমার এ রূপ-সে যে তোমায় ভালোবাসার ছবি।।
আপন জেনে হাত বাড়ালো-
আকাশ বাতাস প্রভাত-আলো,
বিদায়-বেলার সন্ধ্যা-তারা
পুবের অরুণ রবি,-
তুমি ভালোবাস ব’লে ভালোবাসে সবি?
আমার আমি লুকিয়েছিল তোমার ভালোবাসায়,
তুমিই আমার মাঝে আসি’
অসিতে মোর বাজাও বাঁশি,
আমার পূজার যা আয়োজন
তোমার প্রাণের হবি।
আমার বাণী জয়মাল্য, রাণি! তোমার সবি।।
তুমি আমায় ভালোবাস তাই তো আমি কবি।
আমার এ রূপ-সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।।

আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

___কাজী নজরুল ইসলাম
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে–
মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।
আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে -
বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার – ভাঙা কল্লোলে।
আসল হাসি, আসল কাঁদন
মুক্তি এলো, আসল বাঁধন,
মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মোর তিক্ত দুখের সুখ আসে।
ঐ রিক্ত বুকের দুখ আসে -
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!
আসল উদাস, শ্বসল হুতাশ
সৃষ্টি-ছাড়া বুক-ফাটা শ্বাস,
ফুললো সাগর দুললো আকাশ ছুটলো বাতাস,
গগন ফেটে চক্র ছোটে, পিণাক-পাণির শূল আসে!
ঐ ধূমকেতু আর উল্কাতে
চায় সৃষ্টিটাকে উল্টাতে,
আজ তাই দেখি আর বক্ষে আমার লক্ষ বাগের ফুল হাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!
আজ হাসল আগুন, শ্বসল ফাগুন,
মদন মারে খুন-মাখা তূণ
পলাশ অশোক শিমুল ঘায়েল
ফাগ লাগে ঐ দিক-বাসে
গো দিগ বালিকার পীতবাসে;
আজ রঙ্গন এলো রক্তপ্রাণের অঙ্গনে মোর চারপাশে
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে!
আজ কপট কোপের তূণ ধরি,
ঐ আসল যত সুন্দরী,
কারুর পায়ে বুক ডলা খুন, কেউ বা আগুন,
কেউ মানিনী চোখের জলে বুক ভাসে!
তাদের প্রাণের ‘বুক-ফাটে-তাও-মুখ-ফোটে-না’ বাণীর বীণা মোর পাশে
ঐ তাদের কথা শোনাই তাদের
আমার চোখে জল আসে
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে!
আজ আসল ঊষা, সন্ধ্যা, দুপুর,
আসল নিকট, আসল সুদূর
আসল বাধা-বন্ধ-হারা ছন্দ-মাতন
পাগলা-গাজন-উচ্ছ্বাসে!
ঐ আসল আশিন শিউলি শিথিল
হাসল শিশির দুবঘাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!
আজ জাগল সাগর, হাসল মরু
কাঁপল ভূধর, কানন তরু
বিশ্ব-ডুবান আসল তুফান, উছলে উজান
ভৈরবীদের গান ভাসে,
মোর ডাইনে শিশু সদ্যোজাত জরায়-মরা বামপাশে।
মন ছুটছে গো আজ বল্গাহারা অশ্ব যেন পাগলা সে।
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!!

খুকি ও কাঠবেড়ালি

___কাজী নজরুল ইসলাম
কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি-নেবু? লাউ?
বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও-
ডাইনি তুমি হোঁৎকা পেটুক,
খাও একা পাও যেথায় যেটুক!
বাতাবি-নেবু সকলগুলো
একলা খেলে ডুবিয়ে নুলো!
তবে যে ভারি ল্যাজ উঁচিয়ে পুটুস পাটুস চাও?
ছোঁচা তুমি! তোমার সঙ্গে আড়ি আমার! যাও!
কাঠবেড়ালি! বাঁদরীমুখী! মারবো ছুঁড়ে কিল?
দেখবি তবে? রাঙাদাকে ডাকবো? দেবে ঢিল!
পেয়ারা দেবে? যা তুই ওঁচা!
তাই তোর নাকটি বোঁচা!
হুতমো-চোখী! গাপুস গুপুস
একলাই খাও হাপুস হুপুস!
পেটে তোমার পিলে হবে! কুড়ি-কুষ্টি মুখে!
হেই ভগবান! একটা পোকা যাস পেটে ওর ঢুকে!
ইস! খেয়ো না মস্তপানা ঐ সে পাকাটাও!
আমিও খুবই পেয়ারা খাই যে! একটি আমায় দাও!
কাঠবেড়ালি! তুমি আমার ছোড়দি’ হবে? বৌদি হবে? হুঁ!
রাঙা দিদি? তবে একটা পেয়ারা দাও না! উঃ!
এ রাম! তুমি ন্যাংটা পুঁটো?
ফ্রকটা নেবে? জামা দুটো?
আর খেয়ো না পেয়ার তবে,
বাতাবি-নেবুও ছাড়তে হবে!
দাঁত দেখিয়ে দিচ্ছ ছুট? অ’মা দেখে যাও!-
কাঠবেড়ালি! তুমি মর! তুমি কচু খাও!!

কুলি-মজুর

___নজরুল ইসলাম
দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?
যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে,
বাবু সা’ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।
বেতন দিয়াছ?-চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল্‌?
রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,
রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,
বল ত এসব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা
কার খুনে রাঙা?-ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি হঁটে আছে লিখা।
তুমি জান না ক’, কিন- পথের প্রতি ধূলিকণা জানে,
ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!
আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!
তুমি শুয়ে র’বে তেতালার পরে আমরা রহিব নীচে,
অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে!
সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে
এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে!
তারি পদরজ অঞ্জলি করি’ মাথায় লইব তুলি’,
সকলের সাথে পথে চলি’ যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি!
আজ নিখিলের বেদনা -আর্ত পীড়িতের মাখি’ খুন,
লালে লাল হ’য়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ!
আজ হৃদয়ের জমা-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও,
রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও!
আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল,
মাতামাতি ক’রে ঢুকুক্‌ এ বুকে, খুলে দাও যত খিল!
সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়-ক আমাদের এই ঘরে,
মোদের মাথায় চন্দ্র সূর্য তারারা পড়-ক ঝ’রে।
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি’
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।
একজনে দিলে ব্যথা-
সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।
একের অসম্মান
নিখিল মানব-জাতির লজ্জা-সকলের অপমান!
মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,
উর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান!

সাহেব ও মোসাহেব

___কাজী নজরুল ইসলাম
সাহেব কহেন, “চমৎকার! সে চমৎকার!”
মোসাহেব বলে, “চমৎকার সে হতেই হবে যে!
হুজুরের মতে অমত কার?”
সাহেব কহেন, “কী চমৎকার,
বলতেই দাও, আহা হা!”
মোসাহেব বলে, “হুজুরের কথা শুনেই বুঝেছি,
বাহাহা বাহাহা বাহাহা!”
সাহেব কহেন, “কথাটা কি জান? সেদিন -”
মোসাহেব বলে, “জানি না আবার?
ঐ যে, কি বলে, যেদিন -”
সাহেব কহেন, “সেদিন বিকেলে
বৃষ্টিটা ছিল স্বল্প।”
মোসাহেব বলে, “আহা হা, শুনেছ?
কিবা অপরুপ গল্প!”
সাহেব কহেন, “আরে ম’লো! আগে
বলতেই দাও গোড়াটা!”
মোসাহেব বলে, “আহা-হা গোড়াটা! হুজুরের গোড়া!
এই, চুপ, চুপ ছোঁড়াটা!”
সাহেব কহেন, “কি বলছিলাম,
গোলমালে গেল গুলায়ে!”
মোসাহেব বলে, “হুজুরের মাথা! গুলাতেই হবে।
দিব কি হস্ত বুলায়ে?”
সাহেব কহেন, “শোনো না! সেদিন
সূর্য্য উঠেছে সকালে!”
মোসাহেব বলে, “সকালে সূর্য্য? আমরা কিন্তু
দেখি না কাঁদিলে কোঁকালে!”
সাহেব কহেন, “ভাবিলাম, যাই,
আসি খানিকটা বেড়ায়ে,”
মোসাহেব বলে, “অমন সকাল! যাবে কোথা বাবা,
হুজুরের চোখ এড়ায়ে!”
সাহেব কহেন, “হ’ল না বেড়ানো,
ঘরেই রহিনু বসিয়া!”
মোসাহেব বলে, “আগেই বলেছি! হুজুর কি চাষা,
বেড়াবেন হাল চষিয়া?”
সাহেব কহেন, “বসিয়া বসিয়া
পড়েছি কখন ঝিমায়ে!”
মোসাহেব বলে, “এই চুপ সব! হুজুর ঝিমান!
পাখা কর, ডাক নিমাইএ”
সাহেব কহেন, “ঝিমাইনি, কই
এই ত জেগেই রয়েছি!”
মোসাহেব বলে, “হুজুর জেগেই রয়েছেন, তা
আগেই সবারে কয়েছি!”
সাহেব কহেন, “জাগিয়া দেখিনু, জুটিয়াছে যত
হনুমান আর অপদেব!”
“হুজুরের চোখ, যাবে কোথা বাবা?”
প্রণামিয়া কয় মোসাহেব।।

কান্ডারী হুশিয়ার

___নজরুল ইসলাম
দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার!
দুলিতেছে তরি, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।
তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!
যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান।
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,
ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার।
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরন
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পন।
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার
গিরি সংকট, ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ,
পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ!
কান্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ?
করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার!
কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর!
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার।
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান,
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান
আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুশিয়ার!
কালকের ফাইনালে উজ্জীবিত বাংলাদেশের বিজয় কামনা করছি।

অবেলার ডাক

___কাজী নজরুল ইসলাম
অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে,
আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে।।
আজ মনে হয় রোজ রাতে সে ঘুম পাড়াত নয়ন চুমে,
চুমুর পরে চুম দিয়ে ফের হান্‌তে আঘাত ভোরের ঘুমে।
ভাব্‌তুম তখন এ কোন্‌ বালাই!
কর্‌ত এ প্রাণ পালাই পালাই।
আজ সে কথা মনে হ’য়ে ভাসি অঝোর নয়ন-ঝরে।
অভাগিনীর সে গরব আজ ধূলায় লুটায় ব্যথার ভারে।।
তর”ণ তাহার ভরাট বুকের উপ্‌চে-পড়া আদর সোহাগ
হেলায় দু’পায় দ’লেছি মা, আজ কেন হায় তার অনুরাগ?
এই চরণ সে বক্ষে চেপে
চুমেছে, আর দু’চোখ ছেপে
জল ঝ’রেছে, তখনো মা কইনি কথা অহঙ্কারে,
এম্‌নি দার”ণ হতাদরে ক’রেছি মা, বিদায় তারে।।
দেখেওছিলাম বুক-ভরা তার অনাদরের আঘাত-কাঁটা,
দ্বার হ’তে সে গেছে দ্বারে খেয়ে সবার লাথি-ঝাটা।
ভেবেছিলাম আমার কাছে
তার দরদের শানি- আছে,
আমিও গো মা ফিরিয়ে দিলাম চিন্‌তে নেরে দেবতারে।
ভিক্ষুবেশে এসেছিল রাজাধিরাজ দাসীর দ্বারে।।
পথ ভুলে সে এসেছিল সে মোর সাধের রাজ-ভিখারী,
মাগো আমি ভিখারিনী, আমি কি তাঁয় চিন্‌তে পারি?
তাই মাগো তাঁর পূজার ডালা
নিইনি, নিইনি মণির মালা,
দেব্‌তা আমার নিজে আমায় পূজল ষোড়শ-উপচারে।
পূজারীকে চিন্‌লাম না মা পূজা-ধূমের অন্ধকারে।।
আমায় চাওয়াই শেষ চাওয়া তার মাগো আমি তা কি জানি?
ধরায় শুধু রইল ধরা রাজ-অতিথির বিদায়-বাণী।
ওরে আমার ভালোবাসা!
কোথায় বেঁধেছিলি বাসা
যখন আমার রাজা এসে দাঁড়িয়েছিল এই দুয়ারে?
নিঃশ্বসিয়া উঠছে ধরা, ‘নেই রে সে নেই, খুঁজিস কারে!’
সে যে পথের চির-পথিক, তার কি সহে ঘরের মায়া?
দূর হ’তে মা দূরন-রে ডাকে তাকে পথের ছায়া।
মাঠের পারে বনের মাঝে
চপল তাহার নূপুর বাজে,
ফুলের সাথে ফুটে বেড়ায়, মেঘের সাথে যায় পাহাড়ে,
ধরা দিয়েও দেয় না ধরা জানি না সে চায় কাহারে?
মাগো আমায় শক্তি কোথায় পথ-পাগলে ধ’রে রাখার?
তার তরে নয় ভালোবাসা সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ডাকার।
তাই মা আমার বুকের কবাট
খুলতে নারল তার করাঘাত,
এ মন তখন কেমন যেন বাসত ভালো আর কাহারে,
আমিই দূরে ঠেলে দিলাম অভিমানী ঘর-হারারে।।
সোহাগে সে ধ’রতে যেত নিবিড় ক’রে বক্ষে চেপে,
হতভাগী পারিয়ে যেতাম ভয়ে এ বুক উঠ্‌ত কেঁপে।
রাজ ভিখারীর আঁখির কালো,
দূরে থেকেই লাগ্‌ত ভালো,
আসলে কাছে ক্ষুধিত তার দীঘল চাওয়া অশ্র”-ভারে।
ব্যথায় কেমন মুষড়ে যেতাম, সুর হারাতাম মনে তরে।।
আজ কেন মা তারই মতন আমারো এই বুকের ক্ষুধা
চায় শুধু সেই হেলায় হারা আদর-সোহাগ পরশ-সুধা,
আজ মনে হয় তাঁর সে বুকে
এ মুখ চেপে নিবিড় সুখে
গভীর দুখের কাঁদন কেঁদে শেষ ক’রে দিই এ আমারে!
যায় না কি মা আমার কাঁদন তাঁহার দেশের কানন-পারে?
আজ বুঝেছি এ-জনমের আমার নিখিল শানি–আরাম
চুরি ক’রে পালিয়ে গেছে চোরের রাজা সেই প্রাণারাম।
হে বসনে-র রাজা আমার!
নাও এসে মোর হার-মানা-হারা!
আজ যে আমার বুক ফেটে যায় আর্তনাদের হাহাকারে,
দেখে যাও আজ সেই পাষাণী কেমন ক’রে কাঁদতে পারে!
তোমার কথাই সত্য হ’ল পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে,
দাবাললের দার”ণ দাহ তুষার-গিরি আজকে দহে।
জাগল বুকে ভীষণ জোয়ার,
ভাঙল আগল ভাঙল দুয়ার
মূকের বুকে দেব্‌তা এলেন মুখর মুখে ভীম পাথারে।
বুক ফেটেছে মুখ ফুটেছে-মাগো মানা ক’র্‌ছ কারে?
স্বর্গ আমার গেছে পুড়ে তারই চ’লে যাওয়ার সাথে,
এখন আমার একার বাসার দোসরহীন এই দুঃখ-রাতে।
ঘুম ভাঙাতে আস্‌বে না সে
ভোর না হ’তেই শিয়র-পাশে,
আস্‌বে না আর গভীর রাতে চুম-চুরির অভিসারে,
কাঁদাবে ফিরে তাঁহার সাথী ঝড়ের রাতি বনের পারে।
আজ পেলে তাঁয় হুম্‌ড়ি খেয়ে প’ড়তুম মাগো যুগল পদে,
বুকে ধ’রে পদ-কোকনদ স্নান করাতাম আঁখির হ্রদে।
ব’সতে দিতাম আধেক আঁচল,
সজল চোখের চোখ-ভরা জল-
ভেজা কাজল মুছতাম তার চোখে মুখে অধর-ধারে,
আকুল কেশে পা মুছাতাম বেঁধে বাহুর কারাগারে।
দেখ্‌তে মাগো তখন তোমার রাক্ষুসী এই সর্বনাশী,
মুখ থুয়ে তাঁর উদার বুকে ব’লত,‘ আমি ভালোবাসি!’
ব’ল্‌তে গিয়ে সুখ-শরমে
লাল হ’য়ে গাল উঠত ঘেমে,
বুক হ’তে মুখ আস্‌ত নেমে লুটিয়ে যখন কোল-কিনারে,
দেখ্‌তুম মাগো তখন কেমন মান ক’রে সে থাক্‌তে পারে!
এম্‌নি এখন কতই আমা ভালোবাসার তৃষ্ণা জাগে
তাঁর ওপর মা অভিমানে, ব্যাথায়, রাগে, অনুরাগে।
চোখের জলের ঋণী ক’রে,
সে গেছে কোন্‌ দ্বীপান-রে?
সে বুঝি মা সাত সমুদ্দুর তের নদীর সুদূরপারে?
ঝড়ের হাওয়া সেও বুঝি মা সে দূর-দেশে যেতে নারে?
তারে আমি ভালোবাসি সে যদি তা পায় মা খবর,
চৌচির হ’য়ে প’ড়বে ফেটে আনন্দে মা তাহার কবর।
চীৎকারে তার উঠবে কেঁপে
ধরার সাগর অশ্র” ছেপে,
উঠবে ক্ষেপে অগ্নি-গিরি সেই পাগলের হুহুঙ্কারে,
ভূধর সাগর আকাশ বাতাস ঘুর্ণি নেচে ঘিরবে তারে।
ছি, মা! তুমি ডুকরে কেন উঠছ কেঁদে অমন ক’রে?
তার চেয়ে মা তারই কোনো শোনা-কথা শুনাও মোরে!
শুনতে শুনতে তোমার কোলে
ঘুমিয়ে পড়ি। – ও কে খোলে
দুয়ার ওমা? ঝড় বুঝি মা তারই মতো ধাক্কা মারে?
ঝোড়ো হওয়া! ঝোড়ো হাওয়া! বন্ধু তোমার সাগর পারে!
সে কি হেথায় আসতে পারে আমি যেথায় আছি বেঁচে,
যে দেশে নেই আমার ছায়া এবার সে সেই দেশে গেছে!
তবু কেন থাকি’ থাকি’,
ইচ্ছা করে তারেই ডাকি!
যে কথা মোর রইল বাকী হায় যে কথা শুনাই কারে?
মাগো আমার প্রাণের কাঁদন আছড়ে মরে বুকের দ্বারে!
যাই তবে মা! দেকা হ’লে আমার কথা ব’লো তারে-
রাজার পূজা-সে কি কভু ভিখারিনী ঠেলতে পারে?
মাগো আমি জানি জানি,
আসবে আবার অভিমানী
খুঁজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে,
ব’লো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!

আমার কৈফিয়ৎ

___নজরুল ইসলাম
বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!
কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’।
পড়ে না ক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!
গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!
মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘ মোল্‌-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’
আনকোরা যত নন্‌ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন্‌ খুশী।
‘ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্‌’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!
‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,
‘নয় চর্‌কার গান কেন গা’বে?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্‌ফুসি!
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!
নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!
‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’
ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’-
যুগের না হই, হজুগের কবি
বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্‌-পেশী,
দু’কানে চশ্‌মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্‌ বেশী!
কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু?
হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!
বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম,
রাজ-সরকার রেখেছেন মান!
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?
বন্ধু! তুমি ত দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,
হাড় কালি হ’ল শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে!
যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,
মেরে মেরে তা’রে করিনু বিকল,
তবু যদি কথা শোনে সে পাগল! মানিল না ররি-গান্ধীরে।
হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে’!
আমি বলি, ওরে কথা শোন্‌ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্‌ খোশ্‌-হালে!
প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস্‌, এবার এ দাঁও ফস্‌কালে
‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়!
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে
নিস্‌ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।
বোঝে না ক’ যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে,
গান শুন সবে ভাবে, ভাবনা কি! দিন যাবে এবে পান খেয়ে!
রবে না ক’ ম্যালেরিয়া মহামারী,
স্বরাজ আসিছে চ’ড়ে জুড়ি-গাড়ী,
চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে।
মাতা কয়, ওরে চুপ্‌ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্‌ চেয়ে!
ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন,
বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।
কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি ও চুন
কেন ওঠে না ক’ তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?
আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!
কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!
টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।
মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!
বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!
পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!