Showing posts with label সুকান্ত ভট্টাচার্য. Show all posts
Showing posts with label সুকান্ত ভট্টাচার্য. Show all posts

Friday, March 17, 2023

ছাড়পত্র

 ___সুকান্ত ভট্টাচার্য

যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে

তার মুখে খবর পেলুমঃ

সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,

নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার

জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।

খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত

উত্তোলিত, উদ্ভাসিত

কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।

সে ভাষা বোঝে না কেউ,

কেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার।

আমি কিন্তু মনে মনে বুঝেছি সে ভাষা।

পেয়েছি নতুন চিঠি আসন্ন যুগের

পরিচয়-পত্র পড়ি ভূমিষ্ঠ শিশুর

অস্পষ্ট কুয়াশাভরা চোখে।

এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;

জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে

চলে যেতে হবে আমাদের।

চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ

প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,

এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি

নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

অবশেষে সব কাজ সেরে

আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে

করে যাব আশীর্বাদ,

তারপর হব ইতিহাস।।

Sunday, August 16, 2015

জাগবার দিন আজ

জাগবার দিন আজ

            ----সুকান্ত ভট্টাচার্যের

জাগবার দিন আজ, দুর্দিন চুপিচুপি আসছে ;
যাদের চোখেতে আজো স্বপ্নের
ছায়া ছবি ভাসছে-
তাদেরই যে দুর্দিন
পরিণামে আরো বেশী জানবে,
মৃত্যুর সঙ্গীন তাদেরই বুকেতে শেল
হানবে ।
আজকের দিন নয় কাব্যের-
আজকের সব কথা পরিণাম আর সম্ভাব্যের ;
শরতের অবকাশে শোনা যায় আকাশের
বাঁশরী,
কিন্তু বাঁশরী বৃথা, জমবে না আজ কোন
আসর-ই ।
আকাশের প্রান্তে যে মৃত্যুর
কালো পাখা বিস্তার-
মৃত্যু ঘরের কোণে, আজ আর নেই
জেনো নিস্তার,
মৃত্যুর কথা আজ ভাবতেও পাও বুঝি কষ্ট
আজকের এই কথা জানি লাগবেই অস্পষ্ট ।
তবুও তোমার চাই চেতনা,
চেতনা থাকলে আজ দুর্দিন আশ্রয় পেত না,
আজকে রঙিন খেলা নিষ্ঠুর
হাতে করো বর্জন,
আজকে যে প্রয়োজন প্রকৃত দেশপ্রেম
অর্জন ;
তাই এসো চেয়ে দেখি পৃথ্বী
কোনখানে ভাঙে আর
কোনখানে গড়ে তার ভিত্তি ।
কোনখানে লাঞ্ছিত মানুষের প্রিয়
ব্যক্তিত্ব,
কোনখানে দানবের ‘মরণ-যজ্ঞ’
চলে নিত্য ;
পণ করো, দৈত্যের অঙ্গে
হানবো বজ্রাঘাত, মিলবো সবাই এক
সঙ্গে ;
সংগ্রাম শুরু করো মুক্তির,
দিন নেই তর্ক ও যুক্তির ।
আজকে শপথ করো সকলে
বাঁচাব আমার দেশ, যাবে না শত্রুর দখলে ;
তাই আজ ফেলে দিয়ে তুলি আর লেখনী,
একতাবদ্ধ হও এখনি ॥

Saturday, August 15, 2015

একটি মোরগের কাহিনী

একটি মোরগের কাহিনী

একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল 
বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে, 
ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায় 
আরো দু'তিনটি মুরগীর সঙ্গে। 
আশ্রয় যদিও মিলল, 
উপযুক্ত আহার মিলল না। 
সুতীক্ষ্ণ চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়ে 
গলা ফাটাল সেই মোরগ 
ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত- 
তবুও সহানুভূতি জানাল না সেই বিরাট শক্ত ইমারত। 

তারপর শুরু হল তাঁর আঁস্তাকুড়ে আনাগোনা; 
আর্শ্চর্য! সেখানে প্রতিদিন মিলতে লাগল 
ফেলে দেওয়া ভাত-রুটির চমৎকার প্রচুর খাবার! 

তারপর এক সময় আঁস্তাকুড়েও এল অংশীদার- 
ময়লা ছেঁড়া ন্যাকড়া পরা দু'তিনটে মানুষ; 
কাজেই দুর্বলতার মোরগের খাবার গেল বন্ধ হয়ে। 

খাবার! খাবার! খানিকটা খাবার! 
অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে 
বার বার চেষ্টা ক'রল প্রাসাদে ঢুকতে, 
প্রত্যেকবারই তাড়া খেল প্রচণ্ড। 
ছোট্ট মোরগ ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখে- 
'প্রাসাদের ভেতর রাশি রাশি খাবার'! 

তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেল, 
একেবারে সোজা চলে এল 
ধব্‌ধবে সাদা দামী কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে ; 
অবশ্য খাবার খেতে নয় 
খাবার হিসেবে

Sunday, February 15, 2015

দেশলাই কাঠি

___সুকান্ত ভট্টাচার্য
আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না :
তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ-
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস ;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি ।
মনে আছে সেদিন হুলুস্থূল বেধেছিল ?
ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন-
আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুড়ে ফেলায় !
কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,
কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাৎ
আমি একাই-ছোট্ট একটা দেশলাই কাঠি ।
এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে
তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের ?
মনে নেই ? এই সেদিন-
আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে ;
চমকে উঠেছিলে-
আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ ।
আমাদের কী অসীম শক্তি
তা তো অনুভব করছে বারংবার ;
তবু কেন বোঝো না,
আমরা বন্দী থাকব না তোমাদের পকেটে পকেটে,
আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব
শহরে, গঞ্জে, গ্রামে-দিগন্ত থেকে দিগন্তে ।
আমরা বারবার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়-
তা তো তোমরা জানোই !
কিন্তু তোমরা তো জানো না :
কবে আমরা জ্বলে উঠব-
সবাই-শেষবারের মতো ॥

রানার

___সুকান্ত ভট্টাচার্য
রানার ছুটেছে তাই ঝুম্‌ঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে
রানার চলেছে, খবরের বোঝা হাতে,
রানার চলেছে রানার!
রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার।
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার–
কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।
রানার! রানার!
জানা-অজানার
বোঝা আজ তার কাঁধে,
বোঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে;
রানার চলেছে, বুঝি ভোর হয় হয়,
আরো জোরে,আরো জোরে, এ রানার দুর্বার দুর্জয়।
তার জীবনের স্বপ্নের মতো পিছে স’রে যায় বন,
আরো পথ, আরো পথ- বুঝি হয় লাল ও-পূর্বকোণ।
অবাক রাতের তারারা, আকাশে মিট্‌মিট্ ক’রে চায়!
কেমন ক’রে এ রানার সবেগে হরিণের মতো যায়!
কত গ্রাম, কত পথ যায় স’রে স’রে–
শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভোরে;
হাতে লণ্ঠন করে ঠন্‌ঠন্, জোনাকিরা দেয় আলো
মাভৈঃ, রানার! এখনো রাতের কালো।
এমনি ক’রেই জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,
পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে ‘মেলে’।
ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে
জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।
অনেক দুঃখে, বহু বেদনায়, অভিমানে, অনুরাগে,
ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে।
রানার! রানার!
এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?
রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে?
ঘরেতে অভাব; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো দোঁয়া,
পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া,
রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে,
দস্যুর ভয়, তারো চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে।
কত চিঠি লেখে লোকে–
কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে।
এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোনো দিনও,
এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ,
এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে,
এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে।
দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি,–
এ-কে যে ভোরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি-
রানার! রানার! কি হবে এ বোঝা ব’য়ে?
কি হবে ক্ষুদার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে?
রানার!রানার ! ভোর তো হয়েছে–আকাশ হয়েছে লাল
আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল?
রানার! গ্রামের রানার!
সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;
শপথের চিঠি নিয়ে চলো আজ
ভীরুতা পিছনে ফেলে–
পৌঁছে দাও এ নতুন খবর
অগ্রগতির ‘মেলে’,
দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি–
নেই, দেরি নেই আর,
ছুটে চলো, ছুটে চলো আরো বেগে
দুর্দম, হে রানার।।