Sunday, February 15, 2015

পঁচিশ বছর পরে

___জীবনানন্দ দাশ
শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে-
বলিলামঃ ‘একদিন এমন সময়
আবার আসিও তুমি-আসিবার ইচ্ছা যদি হয় !-
পঁচিশ বছর পরে ।’
এই ব’লে ফিরে আমি আসিলাম ঘরে ;
তারপর, কতবার চাঁদ আর তারা,
মাঠে-মাঠে মারা গেল, ইঁদুর-পেঁচারা
জ্যোৎস্নায় ধানক্ষেত খুঁজে
এল-গেল ! -চোখ বুজে
কতবার ডানে আর বাঁয়ে
পড়িল ঘুমায়ে
কত-কেউ ! –রহিলাম জেগে
আমি একা-নক্ষত্র যে বেগে
ছুটিছে আকাশে,
তার চেয়ে আগে চ’লে আসে
যদিও সময়,-
পঁচিশ বছর তবুও কই শেষ হয় !-
তারপর – একদিন
আবার হলদে তৃণ
ভ’রে আছে মাঠে-
পাতায়, শুকনো ডাঁটে
ভাসিয়ে কুয়াশা
দিকে –দিকে, -চড়ুয়ের ভাঙা বাসা
শিশিরে গিয়েছে ভিজে,- পথের উপর
পাখির ডিমের খোলা, ঠাণ্ডা –কড়কড় !
শসাফুল,- দু-একটা নষ্ট শাদা শসা,-
মাকড়ের ছেঁড়া জাল, -শুকনো মাকড়সা
লতায়-পাতায় ; -
ফুটফুটে জ্যোৎস্নারাতে পথ চেনা যায় ;
দেখা যায় কয়েকটা তারা
হিম আকাশের গায়,- ইঁদুর-পেঁচারা
ঘুরে ঘুরে মাঠে-মাঠে, ক্ষুদ খেয়ে ওদের
পিপাসা আজো মেটে,
পঁচিশ বছর তবু গেছে কবে কেটে !

কুড়ি বছর পরে

___জীবনানন্দ দাশ
আবার বছর কুড়ি পরে তার
সাথে দেখা যদি হয়
আবার বছর কুড়ি পরে-
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে-
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে- তখন হলুদ
নদী
নরম নরম শর কাশ হোগলায়- মাঠের
ভিতরে !
অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর,
ব্যস্ততা নাই আর,
হাঁসের নীড়ের থেকে খড়
পাখির নীড় থেকে খড়
ছড়াতেছে; মনিয়ার ঘরে রাত, শীত আর
শিশিরের
জল !
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি, কুড়ি,
বছরের
পার-
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই
আমি তোমারে আবার !
হয়তো এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার
পিছনে
সরু- সরু-
কালো কালো ডালপালা মুখে নিয়ে তার,
শিরীষের অথবা জামের
ঝাউয়ের-আমেরঃ
কুড়ি বছরের পরে তখন তোমারে নাই মনে !
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-
কুড়ি বছরের পার-
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার !
তখন
হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেচা নামে-
বাবলার গলির অন্ধকারে
অশথের জানালার ফাকে
কোথায় লুকায় আপনাকে !
চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায়
চিলের
ডানা থামে-
সোনালি সোনালি চিল- শিশির শিকার
করে নিয়ে গেছে তারে-
কুড়ি বছর পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে !

তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়

____কাজী নজরুল ইসলাম।
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়
সেকি মোর অপরাধ?
চাঁদেরে হেরিয়া কাঁদে চকোরিণী
বলে না তো কিছু চাঁদ।।
চেয়ে’ চেয়ে’ দেখি ফোটে যবে ফুল
ফুল বলে না তো সে আমার ভুল
মেঘ হেরি’ ঝুরে’ চাতকিনী
মেঘ করে না তো প্রতিবাদ।
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়
সেকি মোর অপরাধ?।
জানে সূর্যেরে পাবে না
তবু অবুঝ সূর্যমুখী
চেয়ে’ চেয়ে’ দেখে তার দেবতারে
দেখিয়াই সে যে সুখী।।
হেরিতে তোমার রূপ-মনোহর
পেয়েছি এ আঁখি, ওগো সুন্দর।
মিটিতে দাও হে প্রিয়তম মোর
নয়নের সেই সাধ।।
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়
সেকি মোর অপরাধ?

পল্লী-বর্ষা

____জসীমউদ্দিন
আজিকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘের আড়ে,
কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে।
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্ঝুম নিরালায়,
ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়!
বাদলের জলে নাহিয়া সে মেয়ে হেসে কুটি কুটি হয়,
সে হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময়।
কাননের পথে লহর খেলিছে অবিরাম জল-ধারা
তারি স্রোতে আজি শুকনো পাতারা ছুটিয়াছে ঘরছাড়া!
হিজলের বন ফুলের আখরে লিখিয়া রঙিন চিঠি,
নিরালা বাদলে ভাসায়ে দিয়েছে না জানি সে কোন দিঠি!
চিঠির উপরে চিঠি ভেসে যায় জনহীন বন বাটে,
না জানি তাহারা ভিড়িবে যাইয়া কার কেয়া-বন ঘাটে!
কোন্ সে বিরল বুনো ঝাউ শাখে বুনিয়া গোলাপী শাড়ী, -
হয়ত আজিও চেয়ে আছে পথে কানন-কুমার তারি!
দিকে দিগেনে- যতদূর চাহি, পাংশু মেঘের জাল
পায়ে জড়াইয়া পথে দাঁড়ায়েছে আজিকার মহাকাল।
গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায়, -
গল্পের গানে কি জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়!
কেউ বসে বসে বাখারী চাঁচিছে, কেউ পাকাইছে রসি,
কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাঁকা বাঁধে কসি কসি।
কেউ তুলিতেছে বাঁশের লাঠিতে সুন্দর করে ফুল
কেউবা গড়িছে সারিন্দা এক কাঠ কেটে নির্ভুল।
মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ, করুণ ভাটীর সুরে,
আমীর সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে।
লাঠির উপরে, ফুলের উপরে আঁকা হইতেছে ফুল,
কঠিন কাঠ সে সারিন্দা হয়ে বাজিতেছে নির্ভুল।
তারি সাথে সাথে গল্প চলেছে- আমীর সাধুর নাও,
বহুদেশ ঘুরে আজিকে আবার ফিরিয়াছে নিজ গাঁও।
ডাব্বা হুঁকাও চলিয়াছে ছুটি এর হতে ওর হাতে,
নানান রকম রসি বুনানও হইতেছে তার সাথে।
বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরু গুরু মেঘ ডাকে,
এ সবের মাঝে রূপ-কথা যেন আর রূপকথা আঁকে!
যেন ও বৃদ্ধ, গাঁয়ের চাষীরা, আর ওই রূপ-কথা,
বাদলের সাথে মিশিয়া গড়িছে আরেক কল্প-লতা।
বউদের আজ কোনো কাজ নাই, বেড়ায় বাঁধিয়া রসি,
সমুদ্রকলি শিকা বুনাইয়া নীরবে দেখিছে বসি।
কেউবা রঙিন কাঁথায় মেলিয়া বুকের স্বপনখানি,
তারে ভাষা দেয় দীঘল সূতার মায়াবী নকসা টানি।
বৈদেশী কোন্ বন্ধুর লাগি মন তার কেঁদে ফেরে,
মিঠে-সুরি-গান কাঁপিয়ে রঙিন ঠোঁটের বাঁধন ছেঁড়ে।
আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছল ছল জলধারে,
বেণু-বনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।

তিতিক্ষু

___মধুসূদন দত্ত
আমারে তুমি ভালবাসো জেনেই তোমায় ডাকি,
এ জনমে আমি (তোমায়) দিলেম শুধু ফাকি;
মিছামিছি খেলার ছলে
আপনারে ডুবাই জলে
আপনারে ভালবেসে হলেম আজি পাতকী,
আর জেননা আমি কভু তোমায় ভুলে থাকি।
এ জগতের মিথ্যা মোহে তোমারে গেলুম ভুলে,
তবুও তুমি এ অধমরে দাওনি হেলায় ফেলে;
যাদের জন্য এই জীবনে
চাইনি ফিরে তোমার পানে
আজি সেই স্বজনরাই দিলো মোরে দুরে ঠেলে,
তাইতো আমার ভাঙ্গলো ভুল ডাকি তোমা সব ভুলে।
ক্ষমা কর প্রভু মোরে করো না কো অভিমান,
তোমা এ দাস ভুল করেছে, চেয়োনা তার প্রতিদান;
এই অধমরে করো ক্ষমা
ক্ষমাবান জানি তোমা
যদি চাও দিতে পারি জান কোরবান,
ক্ষমা করো দয়াময় - করো মোরে কৃপাদান ॥

কৃষ্ণকলি

___রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে 
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে,
মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে
ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে
কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই।
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু
শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
পূবে বাতাস এল হঠাত্ ধেয়ে,
ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ।
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা,
মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে,
আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
এমনি করে কাজল কালো মেঘ
জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈশান কোণে।
এমনি করে কালো কোমল ছায়া
আষাঢ়মাসে নামে তমাল-বনে।
এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে
হঠাত্ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
আর যা বলে বলুক অন্য লোক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস,
লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

আসমানী

 ___জসীমউদ্দীন
আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক-খান হাড়,
সাক্ষী দিছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি
থাপড়েতে নিবিয়ে দেছে দারুণ অভাব আসি।
পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গা বরণের করছে উপহাস।
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি,
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে,
হয় নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।
আসমানীদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে
ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল্-বিল্-বিল করে।
ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,
সেই জলেতে রান্না-খাওয়া আসমানীদের চলে।
পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,
বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।

আমার মাঝে তোমার লীলা হবে

___ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার মাঝে তোমার লীলা হবে,
তাই তো আমি এসেছি এই ভবে।
এই ঘরে সব খুলে যাবে দ্বার,
ঘুচে যাবে সকল অহংকার,
আনন্দময় তোমার এ সংসার
আমার কিছু আর বাকি না রবে।
মরে গিয়ে বাঁচব আমি, তবে
আমার মাঝে তোমার লীলা হবে।
সব বাসনা যাবে আমার থেমে
মিলে গিয়ে তোমারি এক প্রেমে,
দুঃখসুখের বিচিত্র জীবনে
তুমি ছাড়া আর কিছু না রবে।

অনন্ত প্রেম

_____রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত
রূপে শতবার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয়
গাঁথিয়াছে গীতহার–
কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সেউপহার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।
যত শুনি সেই অতীত কাহিনী, প্রাচীন
প্রেমের
ব্যথা,
অতি পুরাতন বিরহমিলন কথা,
অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে দেখা দেয়
অবশেষে
কালের
তিমিররজনী ভেদিয়া তোমারিমুরতি এসে
চিরস্মৃতিময়ী ধ্র“বতারকার বেশে।
আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি যুগলপ্রেমের
স্রোতে
অনাদি কালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা কোটি প্রেমিকের
মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে, মিলনমধুর লাজে–
পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে।
আজি সেই চির-দিবসের প্রেম অবসান
লভিয়াছে,
রাশি রাশি হয়ে তোমার পায়ের কাছে।
নিখিলের সুখ, নিখিলের দুখ, নিখিল
প্রাণের
প্রীতি,
একটি প্রেমের মাঝারে মিশেছে সকল
প্রেমের
স্মৃতি–
সকল কালের সকল কবির গীতি!!!!

অঘ্রান প্রান্তরে

___জীবনানন্দ দাশ
‘জানি আমি তোমার দু’চোখ আজ
আমাকে খোঁজেনা আর পৃথিবীর’ পরে-
বলে চুপে থামলাম, কেবলি অশত্থ
পাতা পড়ে আছে ঘাসের ভিতরে
শুকনো মিয়োনো ছেঁড়া;-
অঘ্রান
এসেছে আজপৃথিবীর
বনে;
সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে
হেমন্ত এসেছে তবু; বললে সে, ‘ঘাসের
ওপরে সব
বিছানো পাতার
মুখে এই নিস্তব্ধতা কেমন যে-
সন্ধ্যারআবছা অন্ধকার
ছড়িয়ে পড়েছে জলে; কিছুক্ষণ অঘ্রাণের
অস্পষ্ট
জগতে
হাঁটলাম, চিল উড়ে চলে গেছে-কুয়াশার
প্রান্তরের পথে
দু-একটা সজারুর আসা-যাওয়া; উচ্ছল
কলারঝড়ে উড়ে চুপে সন্ধ্যার বাতাসে
লক্ষ্মীপেঁচা হিজলের ফাঁক দিয়ে বাবলার
আঁধার
গলিতে নেমে আসে;
আমাদের জীবনের অনেক অতীত
ব্যাপ্তি আজো যেন
লেগে আছে বহতা পাখায়
ঐ সব পাখিদের ঐ সব দূর দূর ধানক্ষেতে,
ছাতকুড়োমাখা ক্লান্ত জামের শাখায়;
নীলচে ঘাসের ফুলে ফড়িঙের হৃদয়ের
মতো নীরবতা
ছড়িয়ে রয়েছে এই প্রান্তরে বুকে আজ……
হেঁটে চলি…..
আজ কোনো কথা
নেই আর আমাদের; মাঠের কিনারে ঢের
ঝরা ঝাউফল
পড়ে আছে;
খড়কুটো উড়ে এসে লেগে আছে শড়ির
ভিতরে,
সজনে পাতার গুঁড়ি চুলে বেঁধে গিয়ে নড়ে-চড়ে;
পতঙ্গ পালক্ জল-চারি দিকে সূর্যের
উজ্জ্বলতা নাশ;
আলোয়ার মতো ওই
ধানগুলো নড়ে শূন্যে কী রকম অবাধ
আকাশ
হয়ে যায়; সময়ও অপার-তাকে প্রেম
আশা চেতনার কণা
ধরে আছে বলে সে-ও সনাতন;-কিন্তু এই
ব্যর্থ ধারণা
সরিয়ে মেয়েটি তাঁর আঁচলের
চোরাকাঁটা বেছে
প্রান্তর নক্ষত্র নদী আকাশের
থেকে সরে গেছে
যেই স্পষ্ট নির্লিপ্তিতে-তাই-ই ঠিক;-
ওখানে সিগ্ধ হয়
সব।
অপ্রেমে বা প্রেমে নয়- নিখিলের বৃক্ষ নিজ
বিকাশে নীরব।

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে

___রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।
তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে
কোরো না বিড়ম্বিত তারে।
আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো,
আজি ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো,
এই সংগীত-মুখরিত গগনে
তব গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়ো।
এই বাহির ভুবনে দিশা হারায়ে
দিয়ো ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে।
অতি নিবিড় বেদনা বনমাঝে রে
আজি পল্লবে পল্লবে বাজে রে--
দূরে গগনে কাহার পথ চাহিয়া
আজি ব্যাকুল বসুন্ধরা সাজে রে।
মোর পরানে দখিন বায়ু লাগিছে,
কারে দ্বারে দ্বারে কর হানি মাগিছে,
এই সৌরভবিহ্বল রজনী
কার চরণে ধরণীতলে জাগিছে।
ওগো সুন্দর, বল্লভ, কান্ত,
তব গম্ভীর আহ্বান কারে।

আবার আসিব ফিরে

___জীবনানন্দ দাশ
আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ির তীরে — এই
বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল
শালিখের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের
নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ
কাঠাঁলছায়ায়;
হয়তো বা হাঁস হব — কিশোরীর — ঘুঙুর
রহিবে লাল পায়,
সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ
ভরা জলে ভেসে-ভেসে;
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত
ভালোবেসে
জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ
করুণ ডাঙায়;
হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন
উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;
হয়তো শুনিবে এক
লক্ষ্মীপেচাঁ ডাকিতেছে শিমুলের ডালে;
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক
উঠানের ঘাসে;
রূপসা ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক
শাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙা রায় — রাঙা মেঘ
সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক: আমারেই
পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে –

সোনার তরী

___রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।
একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা—
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।
গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু-ধারে—
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে,
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও,
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।
যত চাও তত লও তরণী-’পরে।
আর আছে?— আর নাই, দিয়েছি ভরে।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে—
এখন আমারে লহ করুণা করে।
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই— ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি—
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

জনান্তিকে

___জীবনানন্দ দাশ
তোমাকে দেখার মতো চোখ নেই- তবু,
গভীর বিস্ময়ে আমি টের পাই- তুমি
আজো এই পৃথিবীতে র'য়ে গেছি।
কোথাও সান্ত্বনা নেই পৃথিবীতে আজ;
বহুদিন থেকে শান্তি নেই।
নীড় নেই
পাখিরো মতন কোনো হৃদয়ের তর।
পাখি নেই।
মানুষের হৃদয়কে না জাগালে তাকে
ভোর, পাখি, অথবা বসন্তকাল ব’লে
আজ তার মানবকে কী ক’রে চানাতে পারে কেউ।
চারিদিকে অগণন মেশিন ও মেশিনের দেবতার কাছে
নিজেকে স্বাধীন ব’লে মনে ক’রে নিতে গিয়ে তবু
মানুষ এখনও বিশৃঙ্খল।
দিনের আলোর দিকে তাকালেয় দেখা যায় লোক
কেবলি আহত হ’য়ে মৃত হ’য়ে স্তব্ধ হয়;
এ ছাড়া নির্মল কোনো জননীতি নেই।
যে-মানুষ- যেই দেশে টিঁকে থাকে সে-ই
ব্যক্তি হয়- রাজ্য গড়ে- সাম্রাজ্যের মতো কোনো ভূমি
চায়। ব্যক্তির দাবিতে তাই সাম্রাজ্য ভেঙে গিয়ে
তারই পিপাসায়
গ’ড়ে ওঠে।
এ ছাড়া অমল কোনো রাজনীতি পেতে হ’লে তবে
উজ্জ্বল সময়স্রোতে চ’লে যেতে হয়।
সেই স্রোত আজো এই শতাব্দীর তরে নয়।
সকলের তরে নয়।
পঙ্গপালের মতো মানুষেরা চরে;
ঝ’রে পড়ে।
এই সব দিনমান মৃত্যু আশা আলো গুনে নিতে
ব্যাপ্ত হ’তে হয়।
নবপ্রস্থানের দিকে হৃদয় চলেছে।
চোখ না এড়ায়ে তবু অকস্মাৎ কখনো ভোরের জনান্তিকে
চোখে থেকে যায়
আরো-এক আভাঃ
আমাদের এই পৃথিবীর এই ধৃষ্ট শতাব্দীর
হৃদয়ের নয়- তবু হৃদয়ের নিজের জিনিস
হ’য়ে তুমি র’য়ে গেছ।
তোমার মাথাত চুলে কেবলই রাত্রের মতো চুল
তারকার অনটনে ব্যাপক বিপুল
রাতের মতন তার একটি নির্জন নক্ষত্রকে
ধ’রে আছে।
তোমার হৃদয়ে গায়ে আমাদের জনমানবিক
রাত্রি নেই। আমাদের প্রাণে এক তিল
বেশি রাত্রির মতো আমাদের মানব্জীবন
প্রাচারিত হ’য়ে গেছে ব’লে-
নারি,
সেই এক তিল কম।
আর্ত রাত্রি তুমি।
শুধু অন্তহীন ঢল, মানব-খচিত সাঁকো, শুধু অমানব নদীদের
অপর নারীর কন্ঠ তোমার নারীর দেহ ঘিরে;
অতএব তার সেই সপ্রতিভ অমেয় শরীরে
আমাদের আজকের পরিভাষা ছাড়া আরো নারী
আছে। আমাদের যুগের অতীত এক কাল
র’য়ে গেছে।
নিজের নুড়ির ’পরে সারাদিন নদী
সূর্যের- সুরের বীথি, তবু
নিমেষে উপল নেই- জলও কোন্‌ অতীতে মরেছে;
তবু নবীন নুড়ি- নতুন উজ্জ্বল জল নিয়ে আসে নদী;
জানি আমি জানি আদি নারী শরীরিণীকে স্মৃতির
(আজকে হেমন্ত ভোরে) সে কবের আঁধার অবধি;
সৃষ্টির ভীষণ অমা ক্ষমাহীনতায়
মানবের হৃদয়ের ভাঙা নীলিমায়
বকুলের বনে মনে অপার রক্তের ঢলে গ্লেশিয়ারে জলে
অসতী না হয় তবু স্মরণীয় অনন্ত উপলে
প্রিয়াকে পীড়ন ক’রে কোথায় নভের দিকে চলে।

তবু মনে রেখো

___রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তবু মনে রেখো, যদি দূরে যাই চলি,
সেই পুরাতন প্রেম যদি এক কালে
হয়ে আসে দূরস্মৃত কাহিনী কেবলি—
ঢাকা পড়ে নব নব জীবনের জালে।
তবু মনে রেখো, যদি বড়ো কাছে থাকি,
নূতন এ প্রেম যদি হয় পুরাতন,
দেখে না দেখিতে পায় যদি শ্রান্ত আঁখি—
পিছনে পড়িয়া থাকি ছায়ার মতন।
তবু মনে রেখো, যদি তাহে মাঝে মাঝে
উদাস বিষাদভরে কাটে সন্ধ্যাবেলা,
অথবা শারদ প্রাতে বাধা পড়ে কাজে,
অথবা বসন্ত-রাতে থেমে যায় খেলা।
তবু মনে রেখো, যদি মনে প’ড়ে আর
আঁখিপ্রান্তে দেখা নাহি দেয় অশ্রুধার।

তোমায় আমি

___জীবনানন্দ দাশ
তোমায় আমি দেখেছিলাম ব’লে
তুমি আমার পদ্মপাতা হলে;
শিশির কণার মতন শূন্যে ঘুরে
শুনেছিলাম পদ্মপত্র আছে অনেক দূরে
খুঁজে খুঁজে পেলাম তাকে শেষে।
নদী সাগর কোথায় চলে ব’য়ে
পদ্মপাতায় জলের বিন্দু হ’য়ে
জানি না কিছু-দেখি না কিছু আর
এতদিনে মিল হয়েছে তোমার আমার
পদ্মপাতার বুকের ভিতর এসে।
তোমায় ভালোবেসেছি আমি, তাই
শিশির হয়ে থাকতে যে ভয় পাই,
তোমার কোলে জলের বিন্দু পেতে
চাই যে তোমার মধ্যে মিশে যেতে
শরীর যেমন মনের সঙ্গে মেশে।
জানি আমি তুমি রবে-আমার হবে ক্ষয়
পদ্মপাতা একটি শুধু জলের বিন্দু নয়।
এই আছে, নেই-এই আছে নেই-জীবন চঞ্চল;
তা তাকাতেই ফুরিয়ে যায় রে পদ্মপাতার জল
বুঝেছি আমি তোমায় ভালোবেসে !

আমি খুব অল্প কিছু চাই

___হুমায়ুন আহমেদ
আমাকে ভালবাসতে হবে না,
ভালবাসি বলতে হবে না.
মাঝে মাঝে গভীর আবেগ
নিয়ে আমার ঠোঁট
দুটো ছুয়ে দিতে হবে না.
কিংবা আমার জন্য রাত
জাগা পাখিও
হতে হবে না.
অন্য সবার মত আমার
সাথে রুটিন মেনে দেখা
করতে হবে না. কিংবা বিকেল
বেলায় ফুচকাও
খেতে হবে না. এত
অসীম সংখ্যক “না”এর ভিড়ে
শুধু মাত্র একটা কাজ
করতে হবে আমি যখন
প্রতিদিন এক বার “ভালবাসি” বলব
তুমি প্রতিবার
একটা দীর্ঘশ্বাস
ফেলে একটু
খানি আদর মাখা
গলায় বলবে “পাগলি”

রাখাল ছেলে

— জসীমউদদীন
‘রাখাল ছেলে! রাখাল ছেলে! বারেক
ফিরে চাও,
বাঁকা গাঁয়ের পথটি বেয়ে কোথায়
চলে যাও?’
‘ওই যে দেখ নীল-নোয়ান সবুজ ঘেরা গাঁ
কলার পাতা দোলায় চামর শিশির ধোয়ায়
পা;
সেথায় আছে ছোট্ট কুটির সোনার পাতায়
ছাওয়া,
সেই ঘরেতে একলা বসে ডাকছে আমার মা
সেথায় যাব, ও ভাই এবার আমায় ছাড় না!’
রাখাল ছেলে! রাখাল ছেলে! আবার কোথায়
ধাও,
পূব আকাশে ছাড়ল সবে রঙিন মেঘের নাও।’
‘ঘুম হতে আজ জেগেই দেখি শিশির-
ঝরা ঘাসে,
সারা রাতের স্বপন আমার মিঠেল
রোদে হাসে।
আমার সাথে করতে খেলা প্রভাত
হাওয়া ভাই,
সরষে ফুলের
পাঁপড়ি নাড়ি ডাকছে মোরে তাই।
চলতে পথে মটরশুঁটি জড়িয়ে দু-খান পা,
বলছে ডেকে, ‘গাঁয়ের রাখাল একটু খেলে যা!’
সারা মাঠের ডাক এসেছে,
খেলতে হবে ভাই!
সাঁঝের বেলা কইব কথা এখন তবে যাই!’
‘রাখাল ছেলে! রাখাল ছেলে! সারাটা দিন
খেলা,
এ যে বড় বাড়াবাড়ি, কাজ আছে যে মেলা!’
‘কাজের কথা জানিনে ভাই, লাঙল
দিয়ে খেলি
নিড়িয়ে দেই ধানের ক্ষেতের সবিজ রঙের
চেলি
সরষে বালা নুইয়ে গলা হলদে হওয়ার সুখে
মটর বোনে ঘোমটা খুলে চুম দিয়ে যায় মুখে!
ঝাউয়ের ঝাড়ে বাজায় বাঁশি পঊষ-পাগল
বুড়ি,
আমরা সেথা চষতে লাঙল মুর্শিদা-গান
জুড়ি।
খেলা মোদের গান গাওয়া ভাই,
খেলা লাঙল-চষা
সারাটা দিন খেলতে জানি,
জানিইনেকো বসা।

বিদ্রোহী


___কাজী নজরুল ইসলাম
বল বীর - 
        বল উন্নত মম শির! 
শির     নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর! 
             বল বীর - 
বল     মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি' 
        চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি' 
        ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া, 
        খোদার আসন 'আরশ' ছেদিয়া 
             উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর! 
মম     ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর! 
             বল বীর - 
        আমি চির-উন্নত শির! 

আমি     চিরদুর্দ্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস, 
মহা-     প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস, 
আমি     মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর! 
             আমি দুর্ব্বার, 
আমি     ভেঙে করি সব চুরমার! 
আমি     অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল, 
আমি     দ'লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃংখল! 
আমি     মানি নাকো কোনো আইন, 
আমি     ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম, 
                            ভাসমান মাইন! 
আমি     ধূর্জ্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর! 
আমি     বিদ্রোহী আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর! 
             বল বীর - 
         চির উন্নত মম শির! 

আমি     ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণী, 
আমি     পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণী! 
আমি     নৃত্য-পাগল ছন্দ, 
আমি     আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ। 
আমি     হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল, 
আমি     চল-চঞ্চল, ঠুমকি' ছমকি' 
         পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি' 
         ফিং দিয়া দিই তিন দোল্! 
আমি     চপলা-চপল হিন্দোল! 

আমি     তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা', 
করি      শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা, 
         আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা! 
আমি     মহামারী, আমি ভীতি এ ধরিত্রীর। 
আমি     শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর। 
             বল বীর - 
        আমি     চির-উন্নত শির! 

        আমি     চির-দুরন্ত-দুর্ম্মদ, 
আমি     দুর্দ্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দ্দম্ হ্যায়্ হর্দ্দম্ 
                            ভরপুর মদ। 
আমি     হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক, জমদগ্নি, 
আমি     যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি! 
আমি     সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান, 
আমি     অবসান, নিশাবসান। 
আমি     ইন্দ্রাণি-সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য্য, 
মম     এক হাতে-বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য্য। 
আমি     কৃষ্ণ-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির। 
আমি     ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর। 
             বল বীর - 
        চির উন্নত মম শির। 

আমি     সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক 
আমি     যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক! 
আমি     বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস, 
আমি     আপনা ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ! 
আমি     বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার, 
আমি     ইস্ত্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার, 
আমি     পিনাক-পাণির ডমরু-ত্রিশূল, ধর্ম্মরাজের দন্ড, 
আমি     চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ-প্রচন্ড! 
আমি     ক্ষ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য, 
আমি     দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব! 
আমি     প্রাণ-খোলা-হাসি উল্লাস, - আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস, 
আমি     মহা-প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস! 
আমি     কভু প্রশান্ত, - কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী, 
আমি     অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্প-হারী! 
আমি     প্রভঞ্জনের উচ্ছাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল, 
আমি     উজ্জ্বল আমি প্রোজ্জ্বল, 
আমি     উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল্ দোল! 

আমি     বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি, 
আমি     ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম-উদ্দাম, আমি ধন্যি। 
আমি     উন্মন মন উদাসীর, 
আমি     বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর! 
আমি     বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের, 
আমি     অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত 
                            বুকে গতি ফের! 
আমি     অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়, 
চিত-     চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর! 
আমি     গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল ক'রে দেখা অনুখন, 
আমি     চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা'র কাঁকন-চুড়ির কন্-কন্। 
আমি     চির-শিশু, চির-কিশোর, 
আমি     যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর! 
আমি     উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাসী পূরবী হাওয়া, 
আমি     পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীনে গান গাওয়া! 
আমি     আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র রবি, 
আমি     মরু-নির্ঝর ঝর-ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি! - 
আমি     তুরিয়ানন্দে ছুটে চলি এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ! 
আমি     সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে 
                            সব বাঁধ! 

আমি     উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন, 
আমি     বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব বিজয় কেতন! 
ছুটি     ঝড়ের মতন করতালি দিয়া 
        স্বর্গ-মর্ত্ত্য করতলে, 
        তাজি বোরবাক্ আর উচ্চৈস্রবা বাহন আমার 
                            হিম্মত-হ্রেস্বা হেঁকে চলে! 
আমি     বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্নি, কালানল, 
আমি     পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথর-কলরোল-কল-কোলাহল! 
আমি     তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া, দিয়া লম্ফ, 
আণি     ত্রাস সঞ্চারি ভুবনে সহসা, সঞ্চরি' ভূমি-কম্প! 
        ধরি বাসুকির ফনা জাপটি', - 
ধরি     স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি'! 
        আমি দেব-শিশু, আমি চঞ্চল, 
আমি     ধৃষ্ট আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব-মায়ের অঞ্চল! 

             আমি     অর্ফিয়াসের বাঁশরী, 
             মহা-     সিন্ধু উতলা ঘুম্-ঘুম্ 
        ঘুম্ চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুম্ 
        মম বাঁশরী তানে পাশরি' 
        আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী। 
আমি     রুষে উঠে' যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া, 
ভয়ে     সপ্ত নরক হারিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া! 
আমি     বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া! 

আমি     প্লাবন-বন্যা, 
কভু     ধরণীরে করি বরণিয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা - 
আমি     ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা! 
আমি     অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি, 
আমি     ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণি! 
আমি     ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী, 
আমি     জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি! 

আমি     মৃণ্ময়, আমি চিন্ময়, 
আমি     অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়! 
আমি     মানব দানব দেবতার ভয়, 
        বিশ্বের আমি চির দুর্জ্জয়, 
        জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য, 
আমি     তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ-পাতাল-মর্ত্ত্য 
আমি     উন্মাদ, আমি উন্মাদ!! 
আমি     চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে 
                            সব বাঁধ!! 
আমি     পরশুরামের কঠোর কুঠার, 
        নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার! 
আমি     হল বলরাম স্কন্ধে, 
আমি     উপাড়ি' ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে। 

        মহা-     বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত 
        আমি     সেই দিন হব শান্ত, 
যবে     উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, 
        অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না - 
             বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত 
        আমি     সেই দিন হব শান্ত! 
আমি     বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন, 
আমি     স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন! 
আমি     বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন! 
        আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন! 

        আমি চির-বিদ্রোহী বীর - 
আমি     বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!

সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি

__রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি,
দুঃখে তোমায় পেয়েছি প্রাণ ভ'রে।
হারিয়ে তোমায় গোপন রেখেছি,
পেয়ে আবার হারাই মিলন-ঘোরে।
চিরজীবন আমার বীণা-তারে
তোমার আঘাত লাগল বারে বারে,
তাই তো আমার নানা সুরের তানে
তোমার পরশ প্রাণে নিলেম ধ'রে।
আজ তো আমি ভয় করি নে আর
লীলা যদি ফুরায় হেথাকার।
নূতন আলোয় নূতন অন্ধকারে
লও যদি বা নূতন সিন্ধুপারে
তবু তুমি সেই তো আমার তুমি,
আবার তোমায় চিনব নূতন ক'রে।