গুনে গরিমায় আমাদের নারী আদর্শ দুনিয়ায়। রূপে লাবন্যে মাধুরী ও শ্রীতে হুরী পরী লাজ পায়।। নর নহে, নারী ইসলাম পরে প্রথম আনে ঈমান, আম্মা খাদিজা জগতে সর্ব-প্রথম মুসলমান, পুরুষের সব গৌরবস্নান এক এই মহিমায়।। নবী নন্দিনী ফাতেমা মোদের সতী নারীদের রাণী, যাঁর ত্যাগ সেবা স্নেহ ছিল মরূভুমে কওসর পানি, যাঁর গুণ-গাথা ঘরে ঘরে প্রতি নর-নারী আজো গায়।। রহিমার মত মহিমা কাহার, তাঁর সম সতী কেবা, নারী নয় যেন মূর্তি ধরিয়া এসেছিল পতি সেবা মোদের খাওয়ালা জগতের আলা বীরত্বে গরিমায়।। রাজ্য শাসনের রিজিয়ার নাম ইতিহাসে অক্ষয়, শৌর্যে সাহসে চাঁদ সুলতানা বিশ্বের বিস্ময়। জেবুন্নেসার তুলনায় কোথায় জ্ঞানের তাপস্যার।। বারো বছরের বালিকা লায়লা ওহাবীব দলপতি মোদের সাকিনা জাহানারা যেন ধৈর্য মূর্তিমতী, সে গৌরবের গোর হয়ে গেছে আঁধারের বোরকায়।। আঁধার হেরেমে বন্দিনী হলো সহসা আলোর মেয়ে, সেই দিন হতে ইসলাম গেল গ্লানির কালিতে ছেয়ে লক্ষ খালিদা আসিবে, যদি এ নারীরা মুক্তি পায়।।
মাকড়সা সান্-বাঁধা মোর আঙিনাতে জাল বুনেছি কালকে রাতে, ঝুল ঝেড়ে সব সাফ করেছি বাসা। আয় না মাছি আমার ঘরে, আরাম পাবি বসলে পরে, ফরাশ পাতা দেখবি কেমন খাসা!
মাছি থাক্ থাক্ থাক্ আর বলে না, আন্কথাতে মন গলে না- ব্যবসা তোমার সবার আছে জানা। ঢুক্লে তোমার জালের ঘেরে কেউ কোনদিন আর কি ফেরে? বাপ্রে! সেথায় ঢুক্তে মোদের মানা।
মাকড়সা হাওয়ায় দোলে জালের দোলা চারদিকে তার জান্লা খোলা আপ্নি ঘুমে চোখ যে আসে জুড়ে! আয় না হেথা হাত পা ধুয়ে পাখ্না মুড়ে থাক্ না শুয়ে- ভন্ ভন্ ভন্ মরবি কেন উড়ে?
মাছি কাজ নেই মোর দোলায় দুলে, কোথায় তোমার কথায় ভুলে প্রাণটা নিয়ে টান্ পড়ে ভাই শেষে। তোমার ঘরে ঘুম যদি পায় সে ঘুম কভু ভাঙবে না হায়- সে ঘুম নাকি এমন সর্বনেশে!
মাছি লোভ দেখালেই ভুলবে ভবি, ভাবছ আমায় তেমনি লোভী! মিথ্যে দাদা ভোলাও কেন খালি, করব কি ছাই ভাড়ার দেখে? প্রণাম করি আড়াল থেকে- আজকে তোমার সেই গুড়ে ভাই বালি।
মাকড়সা নধর কালো বদন ভরে রূপ যে কত উপচে পড়ে! অবাক দেখি মুকুটমালা শিরে! হাজার চোখে মানিক জ্বলে! ইন্দ্রধনু পাখার তলে! ছয় পা ফেলে আয় না দেখি ধীরে।
মাছি মন ফুর্ফুর্ ফুর্তি নাচে- একটুখানি যাই না কাছে! যাই যাই যাই- বাপ্রে একি বাঁধা। ও দাদা ভাই রক্ষে কর! ফাঁদ পাতা এ কেমন তরো। পড়ে হাত পা হল বাঁধা।
দুষ্টুলোকের মিষ্টি কথায় দুষ্টুলোকের মিষ্টি কথায় নাচলে লোকের স্বস্তি কোথায়? এমনি দশাই তার কপালে লেখা। কথার পাকে মানুষ মেরে মাকড়জীবী ঐ যে ফেরে, গড় করি তার অনেক তফাৎ থেকে।
একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে, ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায় আরো দু'তিনটি মুরগীর সঙ্গে। আশ্রয় যদিও মিলল, উপযুক্ত আহার মিলল না। সুতীক্ষ্ণ চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়ে গলা ফাটাল সেই মোরগ ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত- তবুও সহানুভূতি জানাল না সেই বিরাট শক্ত ইমারত।
তারপর শুরু হল তাঁর আঁস্তাকুড়ে আনাগোনা; আর্শ্চর্য! সেখানে প্রতিদিন মিলতে লাগল ফেলে দেওয়া ভাত-রুটির চমৎকার প্রচুর খাবার!
তারপর এক সময় আঁস্তাকুড়েও এল অংশীদার- ময়লা ছেঁড়া ন্যাকড়া পরা দু'তিনটে মানুষ; কাজেই দুর্বলতার মোরগের খাবার গেল বন্ধ হয়ে।
খাবার! খাবার! খানিকটা খাবার! অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে বার বার চেষ্টা ক'রল প্রাসাদে ঢুকতে, প্রত্যেকবারই তাড়া খেল প্রচণ্ড। ছোট্ট মোরগ ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখে- 'প্রাসাদের ভেতর রাশি রাশি খাবার'!
তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেল, একেবারে সোজা চলে এল ধব্ধবে সাদা দামী কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে ; অবশ্য খাবার খেতে নয় খাবার হিসেবে
আজ তাই দেখি আর বক্ষে আমার লক্ষ বাগের ফুল হাসে আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে! আজ হাসল আগুন, শ্বসল ফাগুন, মদন মারে খুন-মাখা তূণ পলাশ অশোক শিমুল ঘায়েল ফাগ লাগে ঐ দিক-বাসে গো দিগ বালিকার পীতবাসে;
আজ রঙ্গন এলো রক্তপ্রাণের অঙ্গনে মোর চারপাশে আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে! আজ কপট কোপের তূণ ধরি, ঐ আসল যত সুন্দরী, কারুর পায়ে বুক ডলা খুন, কেউ বা আগুন, কেউ মানিনী চোখের জলে বুক ভাসে! তাদের প্রাণের ‘বুক-ফাটে-তাও-মুখ-ফোটে-না’ বাণীর বীণা মোর পাশে ঐ তাদের কথা শোনাই তাদের আমার চোখে জল আসে আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে!
আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে; বলেছিলোঃ 'এ নদীর জল তোমার চোখের মত ম্লান বেতফল; সব ক্লান্তি রক্তের থেকে স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি; এই নদী তুমি।'
'এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?' মাছরাঙাদের বললাম; গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিলো নাম। আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি; জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে।
সময়ের অবিরল শাদা আর কালো বনানীর বুক থেকে এসে মাছ আর মন আর মাছরাঙাদের ভালোবেসে ঢের আগে নারী এক - তবু চোখ ঝলসানো আলো ভালোবেসে ষোলো আনা নাগরিক যদি না হয়ে বরং হতো ধানসিঁড়ি নদী।
তুমি অমন ক’রে গো বারে বারে জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না, জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না। ঐ কাতর কন্ঠে থেকে থেকে শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না, শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না।। হাসি দিয়ে যদি লুকালে তোমার সারা জীবনের বেদনা, আজো তবে শুধু হেসে যাও, আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না। ঐ ব্যথাতুর আঁখি কাঁদো-কাঁদো মুখ দেখি আর শুধু হেসে যাও,আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না। চলার তোমার বাকী পথটুকু- পথিক! ওগো সুদূর পথের পথিক- হায়, অমন ক’রে ও অকর”ণ গীতে আঁখির সলিলে ছেয়ো না, ওগো আঁখির সলিলে ছেয়ো না।।
দূরের পথিক! তুমি ভাব বুঝি তব ব্যথা কেউ বোঝে না, তোমার ব্যথার তুমিই দরদী একাকী, পথে ফেরে যারা পথ-হারা, কোন গৃহবাসী তারে খোঁজে না, বুকে ক্ষত হ’য়ে জাগে আজো সেই ব্যথা-লেখা কি? দূর বাউলের গানে ব্যথা হানে বুঝি শুধু ধূ-ধূ মাঠে পথিকে? এ যে মিছে অভিমান পরবাসী! দেখে ঘর-বাসীদের ক্ষতিকে! তবে জান কি তোমার বিদায়- কথায় কত বুক-ভাঙা গোপন ব্যথায় আজ কতগুলি প্রাণ কাঁদিছে কোথায়- পথিক! ওগো অভিমানী দূর পথিক! কেহ ভালোবাসিল না ভেবে যেন আজো মিছে ব্যথা পেয়ে যেয়ো না, ওগো যাবে যাও, তুমি বুকে ব্যথা নিয়ে যেয়ো না।।
কারে দিব দোষ বন্ধু, কারে দিব দোষ! বৃথা কর আস্ফালন, বৃথা কর রোষ। যারা শুধু মরে কিন্তু নাহি দেয় প্রাণ, কেহ কভু তাহাদের করে নি সম্মান। যতই কাগজে কাঁদি, যত দিই গালি, কালামুখে পড়ে তত কলঙ্কের কালি। যে তোমারে অপমান করে অহর্নিশ তারি কাছে তারি 'পরে তোমার নালিশ! নিজের বিচার যদি নাই নিজহাতে, পদাঘাত খেয়ে যদি না পার ফিরাতে-- তবে ঘরে নতশিরে চুপ করে থাক্, সাপ্তাহিকে দিগ্বিদিকে বাজাস নে ঢাক। একদিকে অসি আর অবজ্ঞা অটল, অন্য দিকে মসী আর শুধু অশ্রুজল।
ছুটি হলে রোজ ভাসাই জলে কাগজ-নৌকাখানি। লিখে রাখি তাতে আপনার নাম, লিখি আমাদের বাড়ি কোন গ্রাম বড়ো বড়ো ক'রে মোটা অক্ষরে যতনে লাইন টানি। যদি সে নৌকা আর-কোনো দেশে আর-কারো হাতে পড়ে গিয়ে শেষে আমার লিখন পড়িয়া তখন বুঝিবে সে অনুমানি কার কাছ হতে ভেসে এল স্রোতে কাগজ-নৌকাখানি ।।
আমার নৌকা সাজাই যতনে শিউলি বকুলে ভরি। বাড়ির বাগানে গাছের তলায় ছেয়ে থাকে ফুল সকাল বেলায়, শিশিরের জল করে ঝলমল্ প্রভাতের আলো পড়ি। সেই কুসুমের অতি ছোটো বোঝা কোন্ দিক-পানে চলে যায় সোজা, বেলাশেষে যদি পার হয়ে নদী ঠেকে কোনোখানে যেয়ে - প্রভাতের ফুল সাঁঝে পাবে কূল কাগজের তরী বেয়ে ।।
আমার নৌকা ভাসাইয়া জলে চেয়ে থাকি বসি তীরে। ছোটো ছোটো ঢেউ উঠে আর পড়ে, রবির কিরণে ঝিকিমিকি করে, আকাশেতে পাখি চলে যায় ডাকি, বায়ু বহে ধীরে ধীরে । গগনের তলে মেঘ ভাসে কত আমারি সে ছোটো নৌকার মতো - কে ভাসালে তায়, কোথা ভেসে যায়, কোন দেশে গিয়ে লাগে। ঐ মেঘ আর তরণী আমার কে যাবে কাহার আগে ।।
বেলা হলে শেষে বাড়ি থেকে এসে নিয়ে যায় মোরে টানি আমি ঘরে ফিরি, থাকি কোনে মিশি, যেথা কাটে দিন সেথা কাটে নিশি, কোথা কোন্ গাঁয় ভেসে চলে যায় আমার নৌকাখানি । কোন্ পথে যাবে কিছু নাই জানা, কেহ তারে কভু নাহি করে মানা, ধ'রে নাহি রাখে, ফিরে নাহি ডাকে - ধায় নব নব দেশে। কাগজের তরী, তারি 'পরে চড়ি মন যায় ভেসে ভেসে ।।
রাত হয়ে আসে, শুই বিছানায়, মুখ ঢাকি দুই হাতে - চোখ বুঁজে ভাবি এমন আঁধার, কালী দিয়ে ঢালা নদীর দুধার - তারি মাঝখানে কোথায় কে জানে নৌকা চলেছে রাতে। আকাশের তারা মিটি মিটি করে, শিয়াল ডাকিছে প্রহরে প্রহরে, তরীখানি বুঝি ঘর খুঁজি খুঁজি তীরে তীরে ফিরে ভাসি। ঘুম লয়ে সাথে চড়েছে তাহাতে ঘুম-পাড়ানিয়া মাসি ।।
শুন্ছ দাদা! ঐ যে হোথায় বদ্যি বুড়ো থাকে, সে নাকি রোজ খাবার সময় হাত দিয়ে ভাত মাখে? শুন্ছি নাকি খিদেও পায় সারাদিন না খেলে? চক্ষু নাকি আপনি বোজে ঘুমটি তেমন পেলে?
চল্তে গেলে ঠ্যাং নাকি তার ভূয়েঁর পরে ঠেকে? কান দিয়ে সব শোনে নাকি? চোখ দিয়ে সব দেখে? শোয় নাকি সে মুণ্ডটাকে শিয়র পানে দিয়ে? হয় না কি হয় সত্যি মিথ্যা চল্ না দেখি গিয়ে!
তোমারে বন্দনা করি স্বপ্ন-সহচরী লো আমার অনাগত প্রিয়া, আমার পাওয়ার বুকে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া! তোমারে বন্দনা করি…. হে আমার মানস-রঙ্গিণী, অনন্ত-যৌবনা বালা, চিরন্তন বাসনা-সঙ্গিনী! তোমারে বন্দনা করি…. নাম-নাহি-জানা ওগো আজো-নাহি-আসা! আমার বন্দনা লহ, লহ ভালবাসা…. গোপণ-চারিণী মোর, লো চির-প্রেয়সী! সৃষ্টি-দিন হ’তে কাঁদ’ বাসনার অন্তরালে বসি’- ধরা নাহি দিলে দেহে। তোমার কল্যাণ-দীপ জ্বলিলে না দীপ-নেভা বেড়া-দেওয়া গেহে। অসীমা! এলে না তুমি সীমারেখা-পারে! স্বপনে পাইয়া তোমা’ স্বপনে হারাই বারে বারে অরুপা লো! রহি হ’য়ে এলে মনে, সতী হ’য়ে এলে না ক’ ঘরে। প্রিয় হ’য়ে এলে প্রেমে, বধূ হয়ে এলে না অধরে! দ্রাক্ষা-বুকে রহিলে গোপনে তুমি শিরীন্ শরাব, পেয়ালায় নাহি এলে!- ‘উতারো নেকার’- হাঁকে মোর দুরন্ত কামনা! সুদুরিকা! দূরে থাক’-ভালোবাসা-নিকটে এসো না।
তুমি নহ নিভে যাওয়া আলো, নহ শিখা। তুমি মরীচিকা, তুমি জ্যোতি।- জন্ম-জন্মান্তর ধরি’ লোকে-লোকান্তরে তোমা’ করেছি আরতি, বারে বারে একই জন্মে শতবার করি! যেখানে দেখেছি রূপ,-করেছি বন্দনা প্রিয়া তোমারেই স্মরি’। রূপে রূপে, অপরূপা, খুঁজেছি তোমায়, পবনের যবনিকা যত তুলি তত বেড়ে যায়! বিরহের কান্না-ধোওয়া তৃপ্ত হিয়া ভরি’ বারে বারে উদিয়াছ ইন্দ্রধনুসমা, হাওয়া-পরী প্রিয় মনোরমা! ধরিতে গিয়োছি-তুমি মিলায়েছ দূর দিগ্বলয়ে ব্যথা-দেওয়া রাণী মোর, এলে না ক’ কথা কওয়া হ’য়ে।
চির-দূরে থাকা ওগো চির-নাহি-আসা! তোমারে দেহের তীরে পাবার দুরাশা গ্রহ হ’তে গ্রহান্তরে ল’য়ে যায় মোরে! বাসনার বিপুল আগ্রহে- জন্ম লভি লোকে-লোকান্তরে! উদ্বেলিত বুকে মোর অতৃপ্ত যৌবন-ক্ষুধা উদগ্র কামনা, জন্ম তাই লভি বারে বারে, না-পাওয়ার করি আরাধনা!…. যা-কিছু সুন্দর হেরি’ ক’রেছি চুম্বন, যা-কিছু চুম্বন দিয়া ক’রেছি সুন্দর- সে-সবার মাঝে যেন তব হরষণ অনুভব করিয়াছি!-ছুঁয়েছি অধর তিলোত্তমা, তিলে তিলে! তোমারে যে করেছি চুম্বন প্রতি তরুণীর ঠোঁটে প্রকাশ গোপন।
যে কেহ প্রিয়ারে তার চুম্বিয়াছে ঘুম-ভাঙা রাতে, রাত্রি-জাগা তন্দ্রা-লাগা ঘুম-পাওয়া প্রাতে, সকলের সাথে আমি চুমিয়াছি তোমা’ সকলের ঠোঁটে যেন, হে নিখিল-প্রিয়া প্রিয়তমা! তরু, লতা, পশু, পাখী, সকলের কামনার সাথে আমার কামনা জাগে,-আমি রমি বিশ্ব-কামনাতে! বঞ্চিত যাহারা প্রেমে, ভুঞ্জে যারা রতি- সকলের মাঝে আমি-সকলের প্রেমে মোর গতি! যে-দিন স্রষ্টার বুকে জেগেছিল আদি সৃষ্টি-কাম, সেই দিন স্রষ্টা সাথে তুমি এলে, আমি আসিলাম। আমি কাম, তুমি হ’লে রতি, তরুণ-তরুণী বুকে নিত্য তাই আমাদের অপরূপ গতি! কী যে তুমি, কী যে নহ, কত ভাবি-কত দিকে চাই! নামে নামে, অ-নামিকা, তোমারে কি খুঁজিনু বৃথাই? বৃথাই বাসিনু ভালো? বৃথা সবে ভালোবাসে মোরে? তুমি ভেবে যারে বুকে চেপে ধরি সে-ই যায় স’রে। কেন হেন হয়, হায়, কেন লয় মনে- যারে ভালো বাসিলাম, তারো চেয়ে ভালো কেহ বাসিছে গোপনে।
সে বুঝি সুন্দরতর-আরো আরো মধু! আমারি বধূর বুকে হাসো তুমি হ’য়ে নববধূ। বুকে যারে পাই, হায়, তারি বুকে তাহারি শয্যায় নাহি-পাওয়া হ’য়ে তুমি কাঁদ একাকিনী, ওগো মোর প্রিয়ার সতিনী।…. বারে বারে পাইলাম-বারে বারে মন যেন কহে- নহে, এ সে নহে! কুহেলিকা! কোথা তুমি? দেখা পাব কবে? জন্মেছিলে জন্মিয়াছ কিম্বা জন্ম লবে? কথা কও, কও কথা প্রিয়া, হে আমার যুগে-যুগে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া!
কহিবে না কথা তুমি! আজ মনে হয়, প্রেম সত্য চিরন্তন, প্রেমের পাত্র সে বুঝি চিরন্তন নয়। জন্ম যার কামনার বীজে কামনারই মাঝে সে যে বেড়ে যায় কল্পতরু নিজে। দিকে দিকে শাখা তার করে অভিযান, ও যেন শুষিয়া নেবে আকাশের যত বায়ু প্রাণ। আকাশ ঢেকেছে তার পাখা কামনার সবুজ বলাকা!
প্রেম সত্য, প্রেম-পাত্র বহু-আগণন, তাই-চাই, বুকে পাই, তবু কেন কেঁদে ওঠে মন। মদ সত্য, পাত্র সত্য নয়! যে-পাত্রে ঢালিয়া খাও সেই নেশা হয়! চির-সহচরী! এতদিনে পরিচয় পেনু, মরি মরি! আমারি প্রেমের মাঝে রয়েছ গোপন, বৃথা আমি খুঁজে মরি’ জন্মে জন্মে করিনু রোদন। প্রতি রূপে, অপরূপা, ডাক তুমি, চিনেছি তোমায়, যাহারে বাসিব ভালো-সে-ই তুমি, ধরা দেবে তায়! প্রেম এক, প্রেমিকা সে বহু, বহু পাত্রে ঢেলে পি’ব সেই প্রেম- সে শরাব লোহু। তোমারে করিব পান, অ-নামিকা, শত কামনায়, ভৃঙ্গারে, গোলাসে কভু, কভু পেয়ালায়!
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক। মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ। ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে, মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই, শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই। আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
পূবে বাতাস এল হঠাত্ ধেয়ে, ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ। আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা, মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ। আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে, আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
এমনি করে কাজল কালো মেঘ জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈশান কোণে। এমনি করে কালো কোমল ছায়া আষাঢ়মাসে নামে তমাল-বনে। এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে হঠাত্ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, আর যা বলে বলুক অন্য লোক। দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ। মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস, লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
এত হাসি কোথায় পেলে এত কথার খলখলানি কে দিয়েছে মুখটি ভরে কোন বা গাঙের কলকলানি। কে দিয়েছে রঙিন ঠোঁটে কলমী ফুলের গুলগুলানি। কে দিয়েছে চলন বলন কোন সে লতার দোল দুলানী।
কাদের ঘরে রঙিন পুতুল আদরে যে টইটুবানি। কে এনেছে বরণ ডালায় পাটের বনের বউটুবানী। কাদের পাড়ার ঝামুর ঝুমুর কাদের আদর গড়গড়ানি কাদের দেশের কোন সে চাঁদের জোছনা ফিনিক ফুল ছড়ানি।
তোমায় আদর করতে আমার মন যে হলো উড়উড়ানি উড়ে গেলাম সুরে পেলাম ছড়ার গড়ার গড়গড়ানি।
অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে, আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে।। আজ মনে হয় রোজ রাতে সে ঘুম পাড়াত নয়ন চুমে, চুমুর পরে চুম দিয়ে ফের হান্তে আঘাত ভোরের ঘুমে। ভাব্তুম তখন এ কোন্ বালাই! কর্ত এ প্রাণ পালাই পালাই। আজ সে কথা মনে হ’য়ে ভাসি অঝোর নয়ন-ঝরে। অভাগিনীর সে গরব আজ ধূলায় লুটায় ব্যথার ভারে।। তরুণ তাহার ভরাট বুকের উপ্চে-পড়া আদর সোহাগ হেলায় দু’পায় দ’লেছি মা, আজ কেন হায় তার অনুরাগ? এই চরণ সে বক্ষে চেপে চুমেছে, আর দু’চোখ ছেপে জল ঝ’রেছে, তখনো মা কইনি কথা অহঙ্কারে, এম্নি দারুণ হতাদরে ক’রেছি মা, বিদায় তারে।। দেখেওছিলাম বুক-ভরা তার অনাদরের আঘাত-কাঁটা, দ্বার হ’তে সে গেছে দ্বারে খেয়ে সবার লাথি-ঝাটা। ভেবেছিলাম আমার কাছে তার দরদের শানি- আছে, আমিও গো মা ফিরিয়ে দিলাম চিন্তে নেরে দেবতারে। ভিক্ষুবেশে এসেছিল রাজাধিরাজ দাসীর দ্বারে।। পথ ভুলে সে এসেছিল সে মোর সাধের রাজ-ভিখারী, মাগো আমি ভিখারিনী, আমি কি তাঁয় চিন্তে পারি? তাই মাগো তাঁর পূজার ডালা নিইনি, নিইনি মণির মালা, দেব্তা আমার নিজে আমায় পূজল ষোড়শ-উপচারে। পূজারীকে চিন্লাম না মা পূজা-ধূমের অন্ধকারে।। আমায় চাওয়াই শেষ চাওয়া তার মাগো আমি তা কি জানি? ধরায় শুধু রইল ধরা রাজ-অতিথির বিদায়-বাণী। ওরে আমার ভালোবাসা! কোথায় বেঁধেছিলি বাসা যখন আমার রাজা এসে দাঁড়িয়েছিল এই দুয়ারে? নিঃশ্বসিয়া উঠছে ধরা, ‘নেই রে সে নেই, খুঁজিস কারে!’ সে যে পথের চির-পথিক, তার কি সহে ঘরের মায়া? দূর হ’তে মা দূরন-রে ডাকে তাকে পথের ছায়া। মাঠের পারে বনের মাঝে চপল তাহার নূপুর বাজে, ফুলের সাথে ফুটে বেড়ায়, মেঘের সাথে যায় পাহাড়ে, ধরা দিয়েও দেয় না ধরা জানি না সে চায় কাহারে? মাগো আমায় শক্তি কোথায় পথ-পাগলে ধ’রে রাখার? তার তরে নয় ভালোবাসা সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ডাকার। তাই মা আমার বুকের কবাট খুলতে নারল তার করাঘাত, এ মন তখন কেমন যেন বাসত ভালো আর কাহারে, আমিই দূরে ঠেলে দিলাম অভিমানী ঘর-হারারে।। সোহাগে সে ধ’রতে যেত নিবিড় ক’রে বক্ষে চেপে, হতভাগী পারিয়ে যেতাম ভয়ে এ বুক উঠ্ত কেঁপে। রাজ ভিখারীর আঁখির কালো, দূরে থেকেই লাগ্ত ভালো, আসলে কাছে ক্ষুধিত তার দীঘল চাওয়া অশ্র”-ভারে। ব্যথায় কেমন মুষড়ে যেতাম, সুর হারাতাম মনে তরে।। আজ কেন মা তারই মতন আমারো এই বুকের ক্ষুধা চায় শুধু সেই হেলায় হারা আদর-সোহাগ পরশ-সুধা, আজ মনে হয় তাঁর সে বুকে এ মুখ চেপে নিবিড় সুখে গভীর দুখের কাঁদন কেঁদে শেষ ক’রে দিই এ আমারে! যায় না কি মা আমার কাঁদন তাঁহার দেশের কানন-পারে? আজ বুঝেছি এ-জনমের আমার নিখিল শানি–আরাম চুরি ক’রে পালিয়ে গেছে চোরের রাজা সেই প্রাণারাম। হে বসনে-র রাজা আমার! নাও এসে মোর হার-মানা-হারা! আজ যে আমার বুক ফেটে যায় আর্তনাদের হাহাকারে, দেখে যাও আজ সেই পাষাণী কেমন ক’রে কাঁদতে পারে! তোমার কথাই সত্য হ’ল পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে, দাবাললের দার”ণ দাহ তুষার-গিরি আজকে দহে। জাগল বুকে ভীষণ জোয়ার, ভাঙল আগল ভাঙল দুয়ার মূকের বুকে দেব্তা এলেন মুখর মুখে ভীম পাথারে। বুক ফেটেছে মুখ ফুটেছে-মাগো মানা ক’র্ছ কারে? স্বর্গ আমার গেছে পুড়ে তারই চ’লে যাওয়ার সাথে, এখন আমার একার বাসার দোসরহীন এই দুঃখ-রাতে। ঘুম ভাঙাতে আস্বে না সে ভোর না হ’তেই শিয়র-পাশে, আস্বে না আর গভীর রাতে চুম-চুরির অভিসারে, কাঁদাবে ফিরে তাঁহার সাথী ঝড়ের রাতি বনের পারে। আজ পেলে তাঁয় হুম্ড়ি খেয়ে প’ড়তুম মাগো যুগল পদে, বুকে ধ’রে পদ-কোকনদ স্নান করাতাম আঁখির হ্রদে। ব’সতে দিতাম আধেক আঁচল, সজল চোখের চোখ-ভরা জল- ভেজা কাজল মুছতাম তার চোখে মুখে অধর-ধারে, আকুল কেশে পা মুছাতাম বেঁধে বাহুর কারাগারে। দেখ্তে মাগো তখন তোমার রাক্ষুসী এই সর্বনাশী, মুখ থুয়ে তাঁর উদার বুকে ব’লত,‘ আমি ভালোবাসি!’ ব’ল্তে গিয়ে সুখ-শরমে লাল হ’য়ে গাল উঠত ঘেমে, বুক হ’তে মুখ আস্ত নেমে লুটিয়ে যখন কোল-কিনারে, দেখ্তুম মাগো তখন কেমন মান ক’রে সে থাক্তে পারে! এম্নি এখন কতই আমা ভালোবাসার তৃষ্ণা জাগে তাঁর ওপর মা অভিমানে, ব্যাথায়, রাগে, অনুরাগে। চোখের জলের ঋণী ক’রে, সে গেছে কোন্ দ্বীপান-রে? সে বুঝি মা সাত সমুদ্দুর তের নদীর সুদূরপারে? ঝড়ের হাওয়া সেও বুঝি মা সে দূর-দেশে যেতে নারে? তারে আমি ভালোবাসি সে যদি তা পায় মা খবর, চৌচির হ’য়ে প’ড়বে ফেটে আনন্দে মা তাহার কবর। চীৎকারে তার উঠবে কেঁপে ধরার সাগর অশ্রু ছেপে, উঠবে ক্ষেপে অগ্নি-গিরি সেই পাগলের হুহুঙ্কারে, ভূধর সাগর আকাশ বাতাস ঘুর্ণি নেচে ঘিরবে তারে। ছি, মা! তুমি ডুকরে কেন উঠছ কেঁদে অমন ক’রে? তার চেয়ে মা তারই কোনো শোনা-কথা শুনাও মোরে! শুনতে শুনতে তোমার কোলে ঘুমিয়ে পড়ি। - ও কে খোলে দুয়ার ওমা? ঝড় বুঝি মা তারই মতো ধাক্কা মারে? ঝোড়ো হওয়া! ঝোড়ো হাওয়া! বন্ধু তোমার সাগর পারে! সে কি হেথায় আসতে পারে আমি যেথায় আছি বেঁচে, যে দেশে নেই আমার ছায়া এবার সে সেই দেশে গেছে! তবু কেন থাকি’ থাকি’, ইচ্ছা করে তারেই ডাকি! যে কথা মোর রইল বাকী হায় সে কথা শুনাই কারে? মাগো আমার প্রাণের কাঁদন আছড়ে মরে বুকের দ্বারে! যাই তবে মা! দেখা হ’লে আমার কথা ব’লো তারে- রাজার পূজা-সে কি কভু ভিখারিনী ঠেলতে পারে? মাগো আমি জানি জানি, আসবে আবার অভিমানী খুঁজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে, ব’লো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!