Saturday, August 15, 2015

আমাদের নারী

আমাদের নারী

গুনে গরিমায় আমাদের নারী আদর্শ দুনিয়ায়। 
রূপে লাবন্যে মাধুরী ও শ্রীতে হুরী পরী লাজ পায়।। 
নর নহে, নারী ইসলাম পরে প্রথম আনে ঈমান, 
আম্মা খাদিজা জগতে সর্ব-প্রথম মুসলমান, 
পুরুষের সব গৌরবস্নান এক এই  মহিমায়।। 
নবী নন্দিনী ফাতেমা মোদের সতী নারীদের রাণী, 
যাঁর ত্যাগ সেবা স্নেহ ছিল মরূভুমে কওসর পানি, 
যাঁর গুণ-গাথা ঘরে ঘরে প্রতি  নর-নারী আজো গায়।। 
রহিমার মত মহিমা কাহার, তাঁর সম সতী কেবা, 
নারী নয় যেন মূর্তি ধরিয়া এসেছিল পতি সেবা 
মোদের খাওয়ালা জগতের আলা বীরত্বে গরিমায়।। 
রাজ্য শাসনের রিজিয়ার নাম ইতিহাসে অক্ষয়, 
শৌর্যে সাহসে চাঁদ সুলতানা বিশ্বের বিস্ময়। 
জেবুন্নেসার তুলনায় কোথায় জ্ঞানের তাপস্যার।। 
বারো বছরের বালিকা লায়লা ওহাবীব দলপতি 
মোদের সাকিনা জাহানারা যেন ধৈর্য মূর্তিমতী, 
সে গৌরবের গোর হয়ে গেছে আঁধারের বোরকায়।। 
আঁধার হেরেমে বন্দিনী হলো সহসা আলোর মেয়ে, 
সেই দিন হতে ইসলাম গেল গ্লানির কালিতে ছেয়ে 
লক্ষ খালিদা আসিবে, যদি এ নারীরা মুক্তি পায়।।

উত্তম ও অধম

উত্তম ও অধম

কুকুর আসিয়া এমন কামড় 
দিল পথিকের পায় 
কামড়ের চোটে বিষদাঁত ফুটে 
বিষ লেগে গেল তাই। 

ঘরে ফিরে এসে রাত্রে বেচারা 
বিষম ব্যথায় জাগে, 
মেয়েটি তাহার তারি সাথে হায় 
জাগে শিয়রের আগে। 

বাপেরে সে বলে র্ভৎসনা ছলে 
কপালে রাখিয়া হাত, 
তুমি কেন বাবা, ছেড়ে দিলে তারে 
তোমার কি নাই দাতঁ? 

কষ্টে হাসিয়া আর্ত কহিল 
“তুই রে হাসালি মোরে, 
দাঁত আছে বলে কুকুরের পায়ে 
দংশি কেমন করে?” 

কুকুরের কাজ কুকুর করেছে 
কামড় দিয়েছে পায়, 
তা বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে 
মানুষের শোভা পায়? 


মূল : শেখ সা’দী 
অনুবাদ : সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

অস্তচাঁদে

অস্তচাঁদে

ভালোবাসিয়াছি আমি অস্তচাঁদ, -ক্লান্ত শেষপ্রহরের শশী! 
-অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে যবে কালো নদী-ঢেউয়ের কলসী, 
নিঝ্ঝুম বিছানার পরে 
মেঘবৌ'র খোঁপাখসা জোছনাফুল চুপে চুপে ঝরে,- 
চেয়ে থাকি চোখ তুলে'-যেন মোর পলাতকা প্রিয়া 
মেঘের ঘোমটা তুলে' প্রেত-চাঁদে সচকিতে ওঠে শিহরিয়া! 
সে যেন দেখেছে মোরে জন্মে জন্মে ফিরে' ফিরে' ফিরে' 
মাঠে ঘাটে একা একা, -বুনোহাঁস-জোনাকির ভিড়ে! 
দুশ্চর দেউলে কোন্-কোন্ যক্ষ-প্রাসাদের তটে, 
দূর উর-ব্যাবিলোন-মিশরের মরুভূ-সঙ্কটে, 
কোথা পিরামিড তলে, ঈসিসের বেদিকার মূলে, 
কেউটের মতো নীলা যেইখানে ফণা তুলে উঠিয়াছে ফুলে, 
কোন্ মনভুলানিয়া পথচাওয়া দুলালীর মনে 
আমারে দেখেছে জোছনা-চোর চোখে-অলস নয়নে! 
আমারে দেখেছে সে যে আসরীয় সম্রাটের বেশে 
প্রাসাদ-অলিন্দে যবে মহিমায় দাঁড়ায়েছি এসে- 
হাতে তার হাত, পায়ে হাতিয়ার রাখি 
কুমারীর পানে আমি তুলিয়াছি আনন্দের আরক্তিম আঁখি! 
ভোরগেলাসের সুরা-তহুরা, ক'রেছি মোরা চুপে চুপে পান, 
চকোরজুড়ির মতো কুহরিয়া গাহিয়াছি চাঁদিনীর গান! 
পেয়ালায়-পায়েলায় সেই নিশি হয় নি উতলা, 
নীল নিচোলের কোলে নাচে নাই আকাশের তলা! 
নটীরা ঘুমায়েছিল পুরে পুরে, ঘুমের রাজবধূ- 
চুরি করে পিয়েছিনু ক্রীতদাসী বালিকার যৌবনের মধু! 
সম্রাজ্ঞীর নির্দয় আঁখির দর্প বিদ্রূপ ভুলিয়া 
কৃষ্ণাতিথি-চাঁদিনীর তলে আমি ষোড়শীর উরু পরশিয়া 
লভেছিনু উল্লাস-উতরোল!-আজ পড়ে মনে 
সাধ-বিষাদের খেদ কত জন্মজন্মান্তের, রাতের নির্জনে! 

আমি ছিনু 'ক্রবেদুর' কোন্ দূর 'প্রভেন্স্'-প্রান্তরে! 
-দেউলিয়া পায়দল্-অগোচর মনচোর-মানিনীর তরে 
সারেঙের সুর মোর এমনি উদাস রাত্রে উঠিত ঝঙ্কারি! 
আঙুরতলায় ঘেরা ঘুমঘোর ঘরখানা ছাড়ি 
ঘুঘুর পাখনা মেলি মোর পানে আসিল পিয়ারা; 
মেঘের ময়ূরপাখে জেগেছিল এলোমেলো তারা! 
-'অলিভ' পাতার ফাঁকে চুন চোখে চেয়েছিল চাঁদ, 
মিলননিশার শেষে-বৃশ্চিক, গোক্ষুরাফণা, বিষের বিস্বাদ! 

স্পেইনের 'সিয়েরা'য় ছিনু আমি দস্যু-অশ্বারোহী- 
নির্মম-কৃতান্ত-কাল-তবু কী যে কাতর, বিরহী! 
কোন্ রাজনন্দিনীর ঠোঁটে আমি এঁকেছিনু বর্বর চুম্বন! 
অন্দরে পশিয়াছিনু অবেলার ঝড়ের মতন! 
তখন রতনশেজে গিয়েছিল নিভে মধুরাতি, 
নীল জানালার পাশে-ভাঙা হাটে-চাঁদের বেসাতি। 
চুপে চুপে মুখে কার পড়েছিনু ঝুঁকে! 
ব্যাধের মতন আমি টেনেছিনু বুকে 
কোন্ ভীরু কপোতীর উড়ু-উড়ু ডানা! 
-কালো মেঘে কেঁদেছিল অস্তচাঁদ-আলোর মোহানা! 

বাংলার মাঠে ঘাটে ফিরেছিনু বেণু হাতে একা, 
গঙ্গার তীরে কবে কার সাথে হয়েছিল দেখা! 
'ফুলটি ফুটিলে চাঁদিনী উঠিলে' এমনই রূপালি রাতে 
কদমতলায় দাঁড়াতাম গিয়ে বাঁশের বাঁশিটি হাতে! 
অপরাজিতার ঝাড়ে- নদীপারে কিশোরী লুকায়ে বুঝি!- 
মদনমোহন নয়ন আমার পেয়েছিল তারে খুঁজি! 
তারই লাগি বেঁধেছিনু বাঁকা চুলে ময়ূরপাখার চূড়া, 
তাহারই লাগিয়া শুঁড়ি সেজেছিনু-ঢেলে দিয়েছিনু সুরা! 
তাহারই নধর অধর নিঙাড়ি উথলিল বুকে মধু, 
জোনাকির সাথে ভেসে শেষরাতে দাঁড়াতাম দোরে বঁধু! 
মনে পড়ে কি তা!-চাঁদ জানে যাহা, জানে যা কৃষ্ণাতিথির শশী, 
বুকের আগুনে খুন চড়ে-মুখ চুন হয়ে যায় একেলা বসি!

স্মৃতি

স্মৃতি

থমথমে রাত, আমার পাশে বসল অতিথি- 
বললে, আমি অতীত ক্ষুধা-তোমার অতীত স্মৃতি! 
-যে দিনগুলো সাঙ্গ হল ঝড়বাদলের জলে, 
শুষে গেল মেরুর হিমে, মরুর অনলে, 
ছায়ার মতো মিশেছিলাম আমি তাদের সনে; 
তারা কোথায়?-বন্দি স্মৃতিই কাঁদছে তোমার মনে! 
কাঁদছে তোমার মনের খাকে, চাপা ছাইয়ের তলে, 
কাঁদছে তোমার স্যাঁত্সেঁতে শ্বাস-ভিজা চোখের জলে, 
কাঁদছে তোমার মূক মমতার রিক্ত পাথার ব্যেপে, 
তোমার বুকের খাড়ার কোপে, খুনের বিষে ক্ষেপে! 
আজকে রাতে কোন্ সে সুদূর ডাক দিয়েছে তারে,- 
থাকবে না সে ত্রিশূলমূলে, শিবের দেউলদ্বারে! 
মুক্তি আমি দিলেম তারে-উল্লাসেতে দুলে 
স্মৃতি আমার পালিয়ে গেল বুকের কপাট খুলে 
নবালোকে-নবীন উষার নহবতের মাঝে। 
ঘুমিয়েছিলাম, দোরে আমার কার করাঘাত বাজে! 
-আবার আমায় ডাকলে কেন স্বপনঘোরের থেকে! 
অই লোকালোক-শৈলচূড়ায় চরণখানা রেখে 
রয়েছিলাম মেঘের রাঙা মুখের পানে চেয়ে, 
কোথার থেকে এলে তুমি হিম সরণি বেয়ে! 
ঝিম্‌ঝিমে চোখ, জটা তোমার ভাসছে হাওয়ার ঝড়ে, 
শ্মশানশিঙা বাজল তোমার প্রেতের গলার স্বরে! 
আমার চোখের তারার সনে তোমার আঁখির তারা 
মিলে গেল, তোমার মাঝে আবার হলেম হারা! 
-হারিয়ে গেলাম ত্রিশূলমূলে, শিবের দেউলদ্বারে; 
কাঁদছে স্মৃতি-কে দেবে গো-মুক্তি দেবে তারে!

মূর্খ মাছি

মূর্খ মাছি

মাকড়সা 
               সান্‌-বাঁধা মোর আঙিনাতে 
               জাল বুনেছি কালকে রাতে, 
               ঝুল ঝেড়ে সব সাফ করেছি বাসা। 
               আয় না মাছি আমার ঘরে, 
               আরাম পাবি বসলে পরে, 
               ফরাশ পাতা দেখবি কেমন খাসা! 

মাছি 
               থাক্‌ থাক্‌ থাক্‌ আর বলে না, 
               আন্‌কথাতে মন গলে না- 
               ব্যবসা তোমার সবার আছে জানা। 
               ঢুক্‌লে তোমার জালের ঘেরে 
               কেউ কোনদিন আর কি ফেরে? 
               বাপ্‌রে! সেথায় ঢুক্‌তে মোদের মানা। 

মাকড়সা 
               হাওয়ায় দোলে জালের দোলা 
               চারদিকে তার জান্‌লা খোলা 
               আপ্‌নি ঘুমে চোখ যে আসে জুড়ে! 
               আয় না হেথা হাত পা ধুয়ে 
               পাখ্‌না মুড়ে থাক্‌ না শুয়ে- 
               ভন্‌ ভন্‌ ভন্‌ মরবি কেন উড়ে? 

মাছি 
               কাজ নেই মোর দোলায় দুলে, 
               কোথায় তোমার কথায় ভুলে 
               প্রাণটা নিয়ে টান্‌ পড়ে ভাই শেষে। 
               তোমার ঘরে ঘুম যদি পায় 
               সে ঘুম কভু ভাঙবে না হায়- 
               সে ঘুম নাকি এমন সর্বনেশে! 

মাকড়সা 
               মিথ্যে কেন ভাবিস্‌ মনে? 
               দেখ্‌না এসে ঘরের কোণে 
               ভাঁড়ার ভরা খাবার আছে কত! 
               দে-টাপাটপ ফেলবি মুখে 
               নাচ্‌বি গাবি থাক্‌বি সুখে 
               ভাবনা ভুলে বাদ্‌শা-রাজার মতো। 

মাছি 
               লোভ দেখালেই ভুলবে ভবি, 
               ভাবছ আমায় তেমনি লোভী! 
               মিথ্যে দাদা ভোলাও কেন খালি, 
               করব কি ছাই ভাড়ার দেখে? 
               প্রণাম করি আড়াল থেকে- 
               আজকে তোমার সেই গুড়ে ভাই বালি। 

মাকড়সা 
               নধর কালো বদন ভরে 
               রূপ যে কত উপচে পড়ে! 
               অবাক দেখি মুকুটমালা শিরে! 
               হাজার চোখে মানিক জ্বলে! 
               ইন্দ্রধনু পাখার তলে! 
               ছয় পা ফেলে আয় না দেখি ধীরে। 

মাছি 
               মন ফুর্‌ফুর্‌ ফুর্তি নাচে- 
               একটুখানি যাই না কাছে! 
               যাই যাই যাই- বাপ্‌রে একি বাঁধা। 
               ও দাদা ভাই রক্ষে কর! 
               ফাঁদ পাতা এ কেমন তরো। 
               পড়ে হাত পা হল বাঁধা। 

দুষ্টুলোকের মিষ্টি কথায় 
               দুষ্টুলোকের মিষ্টি কথায় 
               নাচলে লোকের স্বস্তি কোথায়? 
               এমনি দশাই তার কপালে লেখা। 
               কথার পাকে মানুষ মেরে 
               মাকড়জীবী ঐ যে ফেরে, 
               গড় করি তার অনেক তফাৎ থেকে।

একটি মোরগের কাহিনী

একটি মোরগের কাহিনী

একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল 
বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে, 
ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায় 
আরো দু'তিনটি মুরগীর সঙ্গে। 
আশ্রয় যদিও মিলল, 
উপযুক্ত আহার মিলল না। 
সুতীক্ষ্ণ চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়ে 
গলা ফাটাল সেই মোরগ 
ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত- 
তবুও সহানুভূতি জানাল না সেই বিরাট শক্ত ইমারত। 

তারপর শুরু হল তাঁর আঁস্তাকুড়ে আনাগোনা; 
আর্শ্চর্য! সেখানে প্রতিদিন মিলতে লাগল 
ফেলে দেওয়া ভাত-রুটির চমৎকার প্রচুর খাবার! 

তারপর এক সময় আঁস্তাকুড়েও এল অংশীদার- 
ময়লা ছেঁড়া ন্যাকড়া পরা দু'তিনটে মানুষ; 
কাজেই দুর্বলতার মোরগের খাবার গেল বন্ধ হয়ে। 

খাবার! খাবার! খানিকটা খাবার! 
অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে 
বার বার চেষ্টা ক'রল প্রাসাদে ঢুকতে, 
প্রত্যেকবারই তাড়া খেল প্রচণ্ড। 
ছোট্ট মোরগ ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখে- 
'প্রাসাদের ভেতর রাশি রাশি খাবার'! 

তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেল, 
একেবারে সোজা চলে এল 
ধব্‌ধবে সাদা দামী কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে ; 
অবশ্য খাবার খেতে নয় 
খাবার হিসেবে

আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে– 
মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে। 

আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে - 
বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার – ভাঙা কল্লোলে। 
আসল হাসি, আসল কাঁদন 
মুক্তি এলো, আসল বাঁধন, 
মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মোর তিক্ত দুখের সুখ আসে। 
ঐ রিক্ত বুকের দুখ আসে - 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে! 

আসল উদাস, শ্বসল হুতাশ 
সৃষ্টি-ছাড়া বুক-ফাটা শ্বাস, 
ফুললো সাগর দুললো আকাশ ছুটলো বাতাস, 
গগন ফেটে চক্র ছোটে, পিণাক-পাণির শূল আসে! 
ঐ ধূমকেতু আর উল্কাতে 
চায় সৃষ্টিটাকে উল্টাতে, 

আজ তাই দেখি আর বক্ষে আমার লক্ষ বাগের ফুল হাসে 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে! 
আজ হাসল আগুন, শ্বসল ফাগুন, 
মদন মারে খুন-মাখা তূণ 
পলাশ অশোক শিমুল ঘায়েল 
ফাগ লাগে ঐ দিক-বাসে 
গো দিগ বালিকার পীতবাসে; 

আজ রঙ্গন এলো রক্তপ্রাণের অঙ্গনে মোর চারপাশে 
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে! 
আজ কপট কোপের তূণ ধরি, 
ঐ আসল যত সুন্দরী, 
কারুর পায়ে বুক ডলা খুন, কেউ বা আগুন, 
কেউ মানিনী চোখের জলে বুক ভাসে! 
তাদের প্রাণের ‘বুক-ফাটে-তাও-মুখ-ফোটে-না’ বাণীর বীণা মোর পাশে 
ঐ তাদের কথা শোনাই তাদের 
আমার চোখে জল আসে 
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে! 

আজ আসল ঊষা, সন্ধ্যা, দুপুর, 
আসল নিকট, আসল সুদূর 
আসল বাধা-বন্ধ-হারা ছন্দ-মাতন 
পাগলা-গাজন-উচ্ছ্বাসে! 
ঐ আসল আশিন শিউলি শিথিল 
হাসল শিশির দুবঘাসে 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে! 

আজ জাগল সাগর, হাসল মরু 
কাঁপল ভূধর, কানন তরু 
বিশ্ব-ডুবান আসল তুফান, উছলে উজান 
ভৈরবীদের গান ভাসে, 
মোর ডাইনে শিশু সদ্যোজাত জরায়-মরা বামপাশে। 

মন ছুটছে গো আজ বল্গাহারা অশ্ব যেন পাগলা সে। 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে! 
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!!

সে

সে

আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে; 
বলেছিলোঃ 'এ নদীর জল 
তোমার চোখের মত ম্লান বেতফল; 
সব ক্লান্তি রক্তের থেকে 
স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি; 
এই নদী তুমি।' 

'এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?' 
মাছরাঙাদের বললাম; 
গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিলো নাম। 
আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি; 
জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে 
কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে। 

সময়ের অবিরল শাদা আর কালো 
বনানীর বুক থেকে এসে 
মাছ আর মন আর মাছরাঙাদের ভালোবেসে 
ঢের আগে নারী এক - তবু চোখ ঝলসানো আলো 
ভালোবেসে ষোলো আনা নাগরিক যদি 
না হয়ে বরং হতো ধানসিঁড়ি নদী।

বিদায়-বেলায়

বিদায়-বেলায়

তুমি অমন ক’রে গো বারে বারে জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না, 
জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না। 
ঐ কাতর কন্ঠে থেকে থেকে শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না, 
শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না।। 
হাসি দিয়ে যদি লুকালে তোমার সারা জীবনের বেদনা, 
আজো তবে শুধু হেসে যাও, আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না। 
ঐ ব্যথাতুর আঁখি কাঁদো-কাঁদো মুখ 
দেখি আর শুধু হেসে যাও,আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না। 
চলার তোমার বাকী পথটুকু- 
পথিক! ওগো সুদূর পথের পথিক- 
হায়, অমন ক’রে ও অকর”ণ গীতে আঁখির সলিলে ছেয়ো না, 
ওগো আঁখির সলিলে ছেয়ো না।। 

দূরের পথিক! তুমি ভাব বুঝি 
তব ব্যথা কেউ বোঝে না, 
তোমার ব্যথার তুমিই দরদী একাকী, 
পথে ফেরে যারা পথ-হারা, 
কোন গৃহবাসী তারে খোঁজে না, 
বুকে ক্ষত হ’য়ে জাগে আজো সেই ব্যথা-লেখা কি? 
দূর বাউলের গানে ব্যথা হানে বুঝি শুধু ধূ-ধূ মাঠে পথিকে? 
এ যে মিছে অভিমান পরবাসী! দেখে ঘর-বাসীদের ক্ষতিকে! 
তবে জান কি তোমার বিদায়- কথায় 
কত বুক-ভাঙা গোপন ব্যথায় 
আজ কতগুলি প্রাণ কাঁদিছে কোথায়- 
পথিক! ওগো অভিমানী দূর পথিক! 
কেহ ভালোবাসিল না ভেবে যেন আজো 
মিছে ব্যথা পেয়ে যেয়ো না, 
ওগো যাবে যাও, তুমি বুকে ব্যথা নিয়ে যেয়ো না।।

দারিদ্র্য

দারিদ্র্য

হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান্‌। 
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান 
কন্টক-মুকুট শোভা।-দিয়াছ, তাপস, 
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস; 
উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি, বাণী ক্ষুরধার, 
বীণা মোর শাপে তব হ’ল তরবার! 
দুঃসহ দাহনে তব হে দর্পী তাপস, 
অম্লান স্বর্ণেরে মোর করিলে বিরস, 
অকালে শুকালে মোর রূপ রস প্রাণ! 
শীর্ণ করপুট ভরি’ সুন্দরের দান 
যতবার নিতে যাই-হে বুভুক্ষু তুমি 
অগ্রে আসি’ কর পান! শূন্য মরুভূমি 
হেরি মম কল্পলোক। আমার নয়ন 
আমারি সুন্দরে করে অগ্নি বরিষণ! 

বেদনা-হলুদ-বৃন্ত কামনা আমার 
শেফালির মত শুভ্র সুরভি-বিথার 
বিকশি’ উঠিতে চাহে, তুমি হে নির্মম, 
দলবৃন্ত ভাঙ শাখা কাঠুরিয়া সম! 
আশ্বিনের প্রভাতের মত ছলছল 
ক’রে ওঠে সারা হিয়া, শিশির সজল 

টলটল ধরণীর মত করুণায়! 
তুমি রবি, তব তাপে শুকাইয়া যায় 
করুণা-নীহার-বিন্দু! ম্লান হ’য়ে উঠি 
ধরণীর ছায়াঞ্চলে! স্বপ্ন যায় টুটি’ 
সুন্দরের, কল্যাণের। তরল গরল 
কন্ঠে ঢালি’ তুমি বল, ‘অমৃতে কি ফল? 
জ্বালা নাই, নেশা নাই. নাই উন্মাদনা,- 
রে দুর্বল, অমরার অমৃত-সাধনা 
এ দুঃখের পৃথিবীতে তোর ব্রত নহে, 
তুই নাগ, জন্ম তোর বেদনার দহে। 
কাঁটা-কুঞ্জে বসি’ তুই গাঁথিবি মালিকা, 
দিয়া গেনু ভালে তোর বেদনার টিকা!…. 
গাহি গান, গাঁথি মালা, কন্ঠ করে জ্বালা, 
দংশিল সর্বাঙ্গে মোর নাগ-নাগবালা!…. 

ভিক্ষা-ঝুলি নিয়া ফের’ দ্বারে দ্বারে ঋষি 
ক্ষমাহীন হে দুর্বাসা! যাপিতেছে নিশি 
সুখে রব-বধূ যথা-সেখানে কখন, 
হে কঠোর-কন্ঠ, গিয়া ডাক-‘মূঢ়, শোন্‌, 
ধরণী বিলাস-কুঞ্জ নহে নহে কারো, 
অভাব বিরহ আছে, আছে দুঃখ আরো, 
আছে কাঁটা শয্যাতলে বাহুতে প্রিয়ার, 
তাই এবে কর্‌ ভোগ!-পড়ে হাহাকার 
নিমেষে সে সুখ-স্বর্গে, নিবে যায় বাতি, 
কাটিতে চাহে না যেন আর কাল-রাতি! 
চল-পথে অনশন-ক্লিষ্ট ক্ষীণ তনু, 
কী দেখি’ বাঁকিয়া ওঠে সহসা ভ্রূ-ধনু, 
দু’নয়ন ভরি’ রুদ্র হানো অগ্নি-বাণ, 
আসে রাজ্যে মহামারী দুর্ভিক্ষ তুফান, 
প্রমোদ-কানন পুড়ে, উড়ে অট্টালিকা,- 
তোমার আইনে শুধু মৃত্যু-দন্ড লিখা! 

বিনয়ের ব্যভিচার নাহি তব পাশ, 
তুমি চান নগ্নতার উলঙ্গ প্রকাশ। 
সঙ্কোচ শরম বলি’ জান না ক’ কিছু, 
উন্নত করিছ শির যার মাথা নীচু। 
মৃত্যু-পথ-যাত্রীদল তোমার ইঙ্গিতে 
গলায় পরিছে ফাঁসি হাসিতে হাসিতে! 
নিত্য অভাবের কুন্ড জ্বালাইয়া বুকে 
সাধিতেছ মৃত্যু-যজ্ঞ পৈশাচিক সুখে! 
লক্ষ্মীর কিরীটি ধরি, ফেলিতেছ টানি’ 
ধূলিতলে। বীণা-তারে করাঘাত হানি’ 
সারদার, কী সুর বাজাতে চাহ গুণী? 
যত সুর আর্তনাদ হ’য়ে ওঠে শুনি! 
প্রভাতে উঠিয়া কালি শুনিনু, সানাই 
বাজিছে করুণ সুরে! যেন আসে নাই 
আজো কা’রা ঘরে ফিরে! কাঁদিয়া কাঁদিয়া 
ডাকিছে তাদেরে যেন ঘরে ‘সানাইয়া’! 
বধূদের প্রাণ আজ সানা’য়ের সুরে 
ভেসে যায় যথা আজ প্রিয়তম দূরে 
আসি আসি করিতেছে! সখী বলে, ‘বল্‌ 
মুছিলি কেন লা আঁখি, মুছিলি কাজল?…. 

শুনিতেছি আজো আমি প্রাতে উঠিয়াই 
‘ আয় আয়’ কাঁদিতেছে তেমনি সানাই। 
ম্লানমুখী শেফালিকা পড়িতেছে ঝরি’ 
বিধবার হাসি সম-স্নিগ্ধ গন্ধে ভরি’! 
নেচে ফেরে প্রজাপতি চঞ্চল পাখায় 
দুরন্ত নেশায় আজি, পুষ্প-প্রগল্‌ভায় 
চুম্বনে বিবশ করি’! ভোমোরার পাখা 
পরাগে হলুদ আজি, অঙ্গে মধু মাখা। 

উছলি’ উঠিছে যেন দিকে দিকে প্রাণ! 
আপনার অগোচরে গেয়ে উঠি গান 
আগমনী আনন্দের! অকারণে আঁখি 
পু’রে আসে অশ্রু-জলে! মিলনের রাখী 
কে যেন বাঁধিয়া দেয় ধরণীর সাথে! 
পুষ্পঞ্জলি ভরি’ দু’টি মাটি মাখা হাতে 
ধরণী এগিয়ে আসে, দেয় উপহার। 
ও যেন কনিষ্ঠা মেয়ে দুলালী আমার!- 
সহসা চমকি’ উঠি! হায় মোর শিশু 
জাগিয়া কাঁদিছ ঘরে, খাওনি ক’ কিছু 
কালি হ’তে সারাদিন তাপস নিষ্ঠুর, 
কাঁদ’ মোর ঘরে নিত্য তুমি ক্ষুধাতুর! 

পারি নাই বাছা মোর, হে প্রিয় আমার, 
দুই বিন্দু দুগ্ধ দিতে!-মোর অধিকার 
আনন্দের নাহি নাহি! দারিদ্র্য অসহ 
পুত্র হ’য়ে জায়া হয়ে কাঁদে অহরহ 
আমার দুয়ার ধরি! কে বাজাবে বাঁশি? 
কোথা পাব আনন্দিত সুন্দরের হাসি? 
কোথা পাব পুষ্পাসব?-ধুতুরা-গেলাস 
ভরিয়া করেছি পান নয়ন-নির্যাস!…. 
আজো শুনি আগমনী গাহিছে সানাই, 
ও যেন কাঁদিছে শুধু-নাই কিছু নাই!

অভিমান

অভিমান

কারে দিব দোষ বন্ধু, কারে দিব দোষ! 
বৃথা কর আস্ফালন, বৃথা কর রোষ। 
যারা শুধু মরে কিন্তু নাহি দেয় প্রাণ, 
কেহ কভু তাহাদের করে নি সম্মান। 
যতই কাগজে কাঁদি, যত দিই গালি, 
কালামুখে পড়ে তত কলঙ্কের কালি। 
যে তোমারে অপমান করে অহর্নিশ 
তারি কাছে তারি 'পরে তোমার নালিশ! 
নিজের বিচার যদি নাই নিজহাতে, 
পদাঘাত খেয়ে যদি না পার ফিরাতে-- 
তবে ঘরে নতশিরে চুপ করে থাক্‌, 
সাপ্তাহিকে দিগ্‌বিদিকে বাজাস নে ঢাক। 
একদিকে অসি আর অবজ্ঞা অটল, 
অন্য দিকে মসী আর শুধু অশ্রুজল। 

কাগজের নৌকা

কাগজের নৌকা

ছুটি হলে রোজ ভাসাই জলে 
কাগজ-নৌকাখানি। 
লিখে রাখি তাতে আপনার নাম, 
লিখি আমাদের বাড়ি কোন গ্রাম 
বড়ো বড়ো ক'রে মোটা অক্ষরে 
যতনে লাইন টানি। 
যদি সে নৌকা আর-কোনো দেশে 
আর-কারো হাতে পড়ে গিয়ে শেষে 
আমার লিখন পড়িয়া তখন 
বুঝিবে সে অনুমানি 
কার কাছ হতে ভেসে এল স্রোতে 
কাগজ-নৌকাখানি ।। 


আমার নৌকা সাজাই যতনে 
শিউলি বকুলে ভরি। 
বাড়ির বাগানে গাছের তলায় 
ছেয়ে থাকে ফুল সকাল বেলায়, 
শিশিরের জল করে ঝলমল্‌ 
প্রভাতের আলো পড়ি। 
সেই কুসুমের অতি ছোটো বোঝা 
কোন্‌ দিক-পানে চলে যায় সোজা, 
বেলাশেষে যদি পার হয়ে নদী 
ঠেকে কোনোখানে যেয়ে - 
প্রভাতের ফুল সাঁঝে পাবে কূল 
কাগজের তরী বেয়ে ।। 


আমার নৌকা ভাসাইয়া জলে 
চেয়ে থাকি বসি তীরে। 
ছোটো ছোটো ঢেউ উঠে আর পড়ে, 
রবির কিরণে ঝিকিমিকি করে, 
আকাশেতে পাখি চলে যায় ডাকি, 
বায়ু বহে ধীরে ধীরে । 
গগনের তলে মেঘ ভাসে কত 
আমারি সে ছোটো নৌকার মতো - 
কে ভাসালে তায়, কোথা ভেসে যায়, 
কোন দেশে গিয়ে লাগে। 
ঐ মেঘ আর তরণী আমার 
কে যাবে কাহার আগে ।। 


বেলা হলে শেষে বাড়ি থেকে এসে 
নিয়ে যায় মোরে টানি 
আমি ঘরে ফিরি, থাকি কোনে মিশি, 
যেথা কাটে দিন সেথা কাটে নিশি, 
কোথা কোন্‌ গাঁয় ভেসে চলে যায় 
আমার নৌকাখানি । 
কোন্‌ পথে যাবে কিছু নাই জানা, 
কেহ তারে কভু নাহি করে মানা, 
ধ'রে নাহি রাখে, ফিরে নাহি ডাকে - 
ধায় নব নব দেশে। 
কাগজের তরী, তারি 'পরে চড়ি 
মন যায় ভেসে ভেসে ।। 


রাত হয়ে আসে, শুই বিছানায়, 
মুখ ঢাকি দুই হাতে - 
চোখ বুঁজে ভাবি এমন আঁধার, 
কালী দিয়ে ঢালা নদীর দুধার - 
তারি মাঝখানে কোথায় কে জানে 
নৌকা চলেছে রাতে। 
আকাশের তারা মিটি মিটি করে, 
শিয়াল ডাকিছে প্রহরে প্রহরে, 
তরীখানি বুঝি ঘর খুঁজি খুঁজি 
তীরে তীরে ফিরে ভাসি। 
ঘুম লয়ে সাথে চড়েছে তাহাতে 
ঘুম-পাড়ানিয়া মাসি ।।

অবাক কাণ্ড

অবাক কাণ্ড

শুন্‌ছ দাদা! ঐ যে হোথায় বদ্যি বুড়ো থাকে, 
সে নাকি রোজ খাবার সময় হাত দিয়ে ভাত মাখে? 
শুন্‌ছি নাকি খিদেও পায় সারাদিন না খেলে? 
চক্ষু নাকি আপনি বোজে ঘুমটি তেমন পেলে? 

চল্‌তে গেলে ঠ্যাং নাকি তার ভূয়েঁর পরে ঠেকে? 
কান দিয়ে সব শোনে নাকি? চোখ দিয়ে সব দেখে? 
শোয় নাকি সে মুণ্ডটাকে শিয়র পানে দিয়ে? 
হয় না কি হয় সত্যি মিথ্যা চল্‌ না দেখি গিয়ে!

অন্ধ মেয়ে

অন্ধ মেয়ে

গভীর কালো মেঘের পরে রঙিন ধনু বাঁকা, 
রঙের তুলি বুলিয়ে মেঘে খিলান যেন আঁকা! 
সবুজ ঘাসে রোদের পাশে আলোর কেরামতি 
রঙিন্ বেশে রঙিন্ ফুলে রঙিন্ প্রজাপতি! 

অন্ধ মেয়ে দেখছে না তা - নাইবা যদি দেখে- 
শীতল মিঠা বাদল হাওয়া যায় যে তারে ডেকে! 
শুনছে সে যে পাখির ডাকে হরয কোলাকুলি 
মিষ্ট ঘাসের গন্ধে তারও প্রাণ গিয়েছে ভুলি! 
দুঃখ সুখের ছন্দে ভরা জগৎ তারও আছে, 
তারও আঁধার জগৎখানি মধুর তারি কাছে।।

অ-নামিকা

অ-নামিকা

তোমারে বন্দনা করি 
স্বপ্ন-সহচরী 
লো আমার অনাগত প্রিয়া, 
আমার পাওয়ার বুকে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া! 
তোমারে বন্দনা করি…. 
হে আমার মানস-রঙ্গিণী, 
অনন্ত-যৌবনা বালা, চিরন্তন বাসনা-সঙ্গিনী! 
তোমারে বন্দনা করি…. 
নাম-নাহি-জানা ওগো আজো-নাহি-আসা! 
আমার বন্দনা লহ, লহ ভালবাসা…. 
গোপণ-চারিণী মোর, লো চির-প্রেয়সী! 
সৃষ্টি-দিন হ’তে কাঁদ’ বাসনার অন্তরালে বসি’- 
ধরা নাহি দিলে দেহে। 
তোমার কল্যাণ-দীপ জ্বলিলে না 
দীপ-নেভা বেড়া-দেওয়া গেহে। 
অসীমা! এলে না তুমি সীমারেখা-পারে! 
স্বপনে পাইয়া তোমা’ স্বপনে হারাই বারে বারে 
অরুপা লো! রহি হ’য়ে এলে মনে, 
সতী হ’য়ে এলে না ক’ ঘরে। 
প্রিয় হ’য়ে এলে প্রেমে, 
বধূ হয়ে এলে না অধরে! 
দ্রাক্ষা-বুকে রহিলে গোপনে তুমি শিরীন্‌ শরাব, 
পেয়ালায় নাহি এলে!- 
‘উতারো নেকার’- 
হাঁকে মোর দুরন্ত কামনা! 
সুদুরিকা! দূরে থাক’-ভালোবাসা-নিকটে এসো না। 

তুমি নহ নিভে যাওয়া আলো, নহ শিখা। 
তুমি মরীচিকা, 
তুমি জ্যোতি।- 
জন্ম-জন্মান্তর ধরি’ লোকে-লোকান্তরে তোমা’ করেছি আরতি, 
বারে বারে একই জন্মে শতবার করি! 
যেখানে দেখেছি রূপ,-করেছি বন্দনা প্রিয়া তোমারেই স্মরি’। 
রূপে রূপে, অপরূপা, খুঁজেছি তোমায়, 
পবনের যবনিকা যত তুলি তত বেড়ে যায়! 
বিরহের কান্না-ধোওয়া তৃপ্ত হিয়া ভরি’ 
বারে বারে উদিয়াছ ইন্দ্রধনুসমা, 
হাওয়া-পরী 
প্রিয় মনোরমা! 
ধরিতে গিয়োছি-তুমি মিলায়েছ দূর দিগ্বলয়ে 
ব্যথা-দেওয়া রাণী মোর, এলে না ক’ কথা কওয়া হ’য়ে। 

চির-দূরে থাকা ওগো চির-নাহি-আসা! 
তোমারে দেহের তীরে পাবার দুরাশা 
গ্রহ হ’তে গ্রহান্তরে ল’য়ে যায় মোরে! 
বাসনার বিপুল আগ্রহে- 
জন্ম লভি লোকে-লোকান্তরে! 
উদ্বেলিত বুকে মোর অতৃপ্ত যৌবন-ক্ষুধা 
উদগ্র কামনা, 
জন্ম তাই লভি বারে বারে, 
না-পাওয়ার করি আরাধনা!…. 
যা-কিছু সুন্দর হেরি’ ক’রেছি চুম্বন, 
যা-কিছু চুম্বন দিয়া ক’রেছি সুন্দর- 
সে-সবার মাঝে যেন তব হরষণ 
অনুভব করিয়াছি!-ছুঁয়েছি অধর 
তিলোত্তমা, তিলে তিলে! 
তোমারে যে করেছি চুম্বন 
প্রতি তরুণীর ঠোঁটে 
প্রকাশ গোপন। 

যে কেহ প্রিয়ারে তার চুম্বিয়াছে ঘুম-ভাঙা রাতে, 
রাত্রি-জাগা তন্দ্রা-লাগা ঘুম-পাওয়া প্রাতে, 
সকলের সাথে আমি চুমিয়াছি তোমা’ 
সকলের ঠোঁটে যেন, হে নিখিল-প্রিয়া প্রিয়তমা! 
তরু, লতা, পশু, পাখী, সকলের কামনার সাথে 
আমার কামনা জাগে,-আমি রমি বিশ্ব-কামনাতে! 
বঞ্চিত যাহারা প্রেমে, ভুঞ্জে যারা রতি- 
সকলের মাঝে আমি-সকলের প্রেমে মোর গতি! 
যে-দিন স্রষ্টার বুকে জেগেছিল আদি সৃষ্টি-কাম, 
সেই দিন স্রষ্টা সাথে তুমি এলে, আমি আসিলাম। 
আমি কাম, তুমি হ’লে রতি, 
তরুণ-তরুণী বুকে নিত্য তাই আমাদের অপরূপ গতি! 
কী যে তুমি, কী যে নহ, কত ভাবি-কত দিকে চাই! 
নামে নামে, অ-নামিকা, তোমারে কি খুঁজিনু বৃথাই? 
বৃথাই বাসিনু ভালো? বৃথা সবে ভালোবাসে মোরে? 
তুমি ভেবে যারে বুকে চেপে ধরি সে-ই যায় স’রে। 
কেন হেন হয়, হায়, কেন লয় মনে- 
যারে ভালো বাসিলাম, তারো চেয়ে ভালো কেহ 
বাসিছে গোপনে। 

সে বুঝি সুন্দরতর-আরো আরো মধু! 
আমারি বধূর বুকে হাসো তুমি হ’য়ে নববধূ। 
বুকে যারে পাই, হায়, 
তারি বুকে তাহারি শয্যায় 
নাহি-পাওয়া হ’য়ে তুমি কাঁদ একাকিনী, 
ওগো মোর প্রিয়ার সতিনী।…. 
বারে বারে পাইলাম-বারে বারে মন যেন কহে- 
নহে, এ সে নহে! 
কুহেলিকা! কোথা তুমি? দেখা পাব কবে? 
জন্মেছিলে জন্মিয়াছ কিম্বা জন্ম লবে? 
কথা কও, কও কথা প্রিয়া, 
হে আমার যুগে-যুগে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া! 

কহিবে না কথা তুমি! আজ মনে হয়, 
প্রেম সত্য চিরন্তন, প্রেমের পাত্র সে বুঝি চিরন্তন নয়। 
জন্ম যার কামনার বীজে 
কামনারই মাঝে সে যে বেড়ে যায় কল্পতরু নিজে। 
দিকে দিকে শাখা তার করে অভিযান, 
ও যেন শুষিয়া নেবে আকাশের যত বায়ু প্রাণ। 
আকাশ ঢেকেছে তার পাখা 
কামনার সবুজ বলাকা! 

প্রেম সত্য, প্রেম-পাত্র বহু-আগণন, 
তাই-চাই, বুকে পাই, তবু কেন কেঁদে ওঠে মন। 
মদ সত্য, পাত্র সত্য নয়! 
যে-পাত্রে ঢালিয়া খাও সেই নেশা হয়! 
চির-সহচরী! 
এতদিনে পরিচয় পেনু, মরি মরি! 
আমারি প্রেমের মাঝে রয়েছ গোপন, 
বৃথা আমি খুঁজে মরি’ জন্মে জন্মে করিনু রোদন। 
প্রতি রূপে, অপরূপা, ডাক তুমি, 
চিনেছি তোমায়, 
যাহারে বাসিব ভালো-সে-ই তুমি, 
ধরা দেবে তায়! 
প্রেম এক, প্রেমিকা সে বহু, 
বহু পাত্রে ঢেলে পি’ব সেই প্রেম- 
সে শরাব লোহু। 
তোমারে করিব পান, অ-নামিকা, শত কামনায়, 
ভৃঙ্গারে, গোলাসে কভু, কভু পেয়ালায়!

কৃষ্ণকলি

কৃষ্ণকলি

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,   
        কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক। 
মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে   
        কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ। 
ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে,   
মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে। 
        কালো? তা সে যতই কালো হোক,   
        দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ। 

ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে   
        ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই, 
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে   
        কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই। 
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু   
শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু। 
        কালো? তা সে যতই কালো হোক,   
        দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ। 

পূবে বাতাস এল হঠাত্‍‌ ধেয়ে, 
        ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ। 
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা, 
        মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ। 
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে, 
আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে। 
        কালো? তা সে যতই কালো হোক, 
        দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ। 

এমনি করে কাজল কালো মেঘ   
        জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈশান কোণে। 
এমনি করে কালো কোমল ছায়া 
        আষাঢ়মাসে নামে তমাল-বনে। 
এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে 
হঠাত্‍‌ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে। 
        কালো? তা সে যতই কালো হোক, 
        দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ। 

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,   
        আর যা বলে বলুক অন্য লোক। 
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে 
        কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ। 
মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস, 
লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ। 
        কালো? তা সে যতই কালো হোক, 
        দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

এত হাসি কোথায় পেলে

এত হাসি কোথায় পেলে

এত হাসি কোথায় পেলে 
এত কথার খলখলানি 
কে দিয়েছে মুখটি ভরে 
কোন বা গাঙের কলকলানি। 
কে দিয়েছে রঙিন ঠোঁটে 
কলমী ফুলের গুলগুলানি। 
কে দিয়েছে চলন বলন 
কোন সে লতার দোল দুলানী। 

কাদের ঘরে রঙিন পুতুল 
আদরে যে টইটুবানি। 
কে এনেছে বরণ ডালায় 
পাটের বনের বউটুবানী। 
কাদের পাড়ার ঝামুর ঝুমুর 
কাদের আদর গড়গড়ানি 
কাদের দেশের কোন সে চাঁদের 
জোছনা ফিনিক ফুল ছড়ানি। 

তোমায় আদর করতে আমার 
মন যে হলো উড়উড়ানি 
উড়ে গেলাম সুরে পেলাম 
ছড়ার গড়ার গড়গড়ানি।

অবেলার ডাক

অবেলার ডাক

অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে, 
      আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে।। 
      আজ মনে হয় রোজ রাতে সে ঘুম পাড়াত নয়ন চুমে, 
     চুমুর পরে চুম দিয়ে ফের হান্‌তে আঘাত ভোরের ঘুমে। 
                  ভাব্‌তুম তখন এ কোন্‌ বালাই! 
                   কর্‌ত এ প্রাণ পালাই পালাই। 
      আজ সে কথা মনে হ’য়ে ভাসি অঝোর নয়ন-ঝরে। 
     অভাগিনীর সে গরব আজ ধূলায় লুটায় ব্যথার ভারে।। 
     তরুণ তাহার ভরাট বুকের উপ্‌চে-পড়া আদর সোহাগ 
   হেলায় দু’পায় দ’লেছি মা, আজ কেন হায় তার অনুরাগ? 
                     এই চরণ সে বক্ষে চেপে 
                    চুমেছে, আর দু’চোখ ছেপে 
       জল ঝ’রেছে, তখনো মা কইনি কথা অহঙ্কারে, 
     এম্‌নি দারুণ হতাদরে ক’রেছি মা, বিদায় তারে।। 
   দেখেওছিলাম বুক-ভরা তার অনাদরের আঘাত-কাঁটা, 
      দ্বার হ’তে সে গেছে দ্বারে খেয়ে সবার লাথি-ঝাটা। 
                    ভেবেছিলাম আমার কাছে 
                    তার দরদের শানি- আছে, 
   আমিও গো মা ফিরিয়ে দিলাম চিন্‌তে নেরে দেবতারে। 
       ভিক্ষুবেশে এসেছিল রাজাধিরাজ দাসীর দ্বারে।। 
   পথ ভুলে সে এসেছিল সে মোর সাধের রাজ-ভিখারী, 
    মাগো আমি ভিখারিনী, আমি কি তাঁয় চিন্‌তে পারি? 
                  তাই মাগো তাঁর পূজার ডালা 
                    নিইনি, নিইনি মণির মালা, 
   দেব্‌তা আমার নিজে আমায় পূজল ষোড়শ-উপচারে। 
     পূজারীকে চিন্‌লাম না মা পূজা-ধূমের অন্ধকারে।। 
আমায় চাওয়াই শেষ চাওয়া তার মাগো আমি তা কি জানি? 
       ধরায় শুধু রইল ধরা রাজ-অতিথির বিদায়-বাণী। 
                     ওরে আমার ভালোবাসা! 
                      কোথায় বেঁধেছিলি বাসা 
       যখন আমার রাজা এসে দাঁড়িয়েছিল এই দুয়ারে? 
   নিঃশ্বসিয়া উঠছে ধরা, ‘নেই রে সে নেই, খুঁজিস কারে!’ 
     সে যে পথের চির-পথিক, তার কি সহে ঘরের মায়া? 
       দূর হ’তে মা দূরন-রে ডাকে তাকে পথের ছায়া। 
                     মাঠের পারে বনের মাঝে 
                     চপল তাহার নূপুর বাজে, 
   ফুলের সাথে ফুটে বেড়ায়, মেঘের সাথে যায় পাহাড়ে, 
    ধরা দিয়েও দেয় না ধরা জানি না সে চায় কাহারে? 
   মাগো আমায় শক্তি কোথায় পথ-পাগলে ধ’রে রাখার? 
    তার তরে নয় ভালোবাসা সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ডাকার। 
                   তাই মা আমার বুকের কবাট 
                   খুলতে নারল তার করাঘাত, 
    এ মন তখন কেমন যেন বাসত ভালো আর কাহারে, 
      আমিই দূরে ঠেলে দিলাম অভিমানী ঘর-হারারে।। 
     সোহাগে সে ধ’রতে যেত নিবিড় ক’রে বক্ষে চেপে, 
     হতভাগী পারিয়ে যেতাম ভয়ে এ বুক উঠ্‌ত কেঁপে। 
                    রাজ ভিখারীর আঁখির কালো, 
                    দূরে থেকেই লাগ্‌ত ভালো, 
   আসলে কাছে ক্ষুধিত তার দীঘল চাওয়া অশ্র”-ভারে। 
  ব্যথায় কেমন মুষড়ে যেতাম, সুর হারাতাম মনে তরে।। 
   আজ কেন মা তারই মতন আমারো এই বুকের ক্ষুধা 
   চায় শুধু সেই হেলায় হারা আদর-সোহাগ পরশ-সুধা, 
                   আজ মনে হয় তাঁর সে বুকে 
                    এ মুখ চেপে নিবিড় সুখে 
  গভীর দুখের কাঁদন কেঁদে শেষ ক’রে দিই এ আমারে! 
যায় না কি মা আমার কাঁদন তাঁহার দেশের কানন-পারে? 
   আজ বুঝেছি এ-জনমের আমার নিখিল শানি–আরাম 
  চুরি ক’রে পালিয়ে গেছে চোরের রাজা সেই প্রাণারাম। 
                  হে বসনে-র রাজা আমার! 
               নাও এসে মোর হার-মানা-হারা! 
   আজ যে আমার বুক ফেটে যায় আর্তনাদের হাহাকারে, 
দেখে যাও আজ সেই পাষাণী কেমন ক’রে কাঁদতে পারে! 
    তোমার কথাই সত্য হ’ল পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে, 
     দাবাললের দার”ণ দাহ তুষার-গিরি আজকে দহে। 
                    জাগল বুকে ভীষণ জোয়ার, 
                    ভাঙল আগল ভাঙল দুয়ার 
    মূকের বুকে দেব্‌তা এলেন মুখর মুখে ভীম পাথারে। 
    বুক ফেটেছে মুখ ফুটেছে-মাগো মানা ক’র্‌ছ কারে? 
     স্বর্গ আমার গেছে পুড়ে তারই চ’লে যাওয়ার সাথে, 
  এখন আমার একার বাসার দোসরহীন এই দুঃখ-রাতে। 
                   ঘুম ভাঙাতে আস্‌বে না সে 
                 ভোর না হ’তেই শিয়র-পাশে, 
     আস্‌বে না আর গভীর রাতে চুম-চুরির অভিসারে, 
    কাঁদাবে ফিরে তাঁহার সাথী ঝড়ের রাতি বনের পারে। 
  আজ পেলে তাঁয় হুম্‌ড়ি খেয়ে প’ড়তুম মাগো যুগল পদে, 
    বুকে ধ’রে পদ-কোকনদ স্নান করাতাম আঁখির হ্রদে। 
                  ব’সতে দিতাম আধেক আঁচল, 
                  সজল চোখের চোখ-ভরা জল- 
    ভেজা কাজল মুছতাম তার চোখে মুখে অধর-ধারে, 
    আকুল কেশে পা মুছাতাম বেঁধে বাহুর কারাগারে। 
    দেখ্‌তে মাগো তখন তোমার রাক্ষুসী এই সর্বনাশী, 
   মুখ থুয়ে তাঁর উদার বুকে ব’লত,‘ আমি ভালোবাসি!’ 
                    ব’ল্‌তে গিয়ে সুখ-শরমে 
                  লাল হ’য়ে গাল উঠত ঘেমে, 
  বুক হ’তে মুখ আস্‌ত নেমে লুটিয়ে যখন কোল-কিনারে, 
দেখ্‌তুম মাগো তখন কেমন মান ক’রে সে থাক্‌তে পারে! 
    এম্‌নি এখন কতই আমা ভালোবাসার তৃষ্ণা জাগে 
    তাঁর ওপর মা অভিমানে, ব্যাথায়, রাগে, অনুরাগে। 
                   চোখের জলের ঋণী ক’রে, 
                   সে গেছে কোন্‌ দ্বীপান-রে? 
     সে বুঝি মা সাত সমুদ্দুর তের নদীর সুদূরপারে? 
  ঝড়ের হাওয়া সেও বুঝি মা সে দূর-দেশে যেতে নারে? 
    তারে আমি ভালোবাসি সে যদি তা পায় মা খবর, 
  চৌচির হ’য়ে প’ড়বে ফেটে আনন্দে মা তাহার কবর। 
                 চীৎকারে তার উঠবে কেঁপে 
                  ধরার সাগর অশ্রু ছেপে, 
     উঠবে ক্ষেপে অগ্নি-গিরি সেই পাগলের হুহুঙ্কারে, 
  ভূধর সাগর আকাশ বাতাস ঘুর্ণি নেচে ঘিরবে তারে। 
  ছি, মা! তুমি ডুকরে কেন উঠছ কেঁদে অমন ক’রে? 
তার চেয়ে মা তারই কোনো শোনা-কথা শুনাও মোরে! 
                শুনতে শুনতে তোমার কোলে 
                 ঘুমিয়ে পড়ি। - ও কে খোলে 
   দুয়ার ওমা? ঝড় বুঝি মা তারই মতো ধাক্কা মারে? 
ঝোড়ো হওয়া! ঝোড়ো হাওয়া! বন্ধু তোমার সাগর পারে! 
   সে কি হেথায় আসতে পারে আমি যেথায় আছি বেঁচে, 
  যে দেশে নেই আমার ছায়া এবার সে সেই দেশে গেছে! 
                    তবু কেন থাকি’ থাকি’, 
                    ইচ্ছা করে তারেই ডাকি! 
   যে কথা মোর রইল বাকী হায় সে কথা শুনাই কারে? 
  মাগো আমার প্রাণের কাঁদন আছড়ে মরে বুকের দ্বারে! 
   যাই তবে মা! দেখা হ’লে আমার কথা ব’লো তারে- 
   রাজার পূজা-সে কি কভু ভিখারিনী ঠেলতে পারে? 
                   মাগো আমি জানি জানি, 
                   আসবে আবার অভিমানী 
  খুঁজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে, 
    ব’লো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!

অঘ্রাণ প্রান্তরে

অঘ্রাণ প্রান্তরে

‘জানি আমি তোমার দু’চোখ আজ আমাকে খোঁজে না আর পৃথিবীর’ পরে- 
বলে চুপে থামলাম, কেবলি অশত্থ পাতা পড়ে আছে ঘাসের ভিতরে 
শুকনো মিয়োনো ছেঁড়া;- অঘ্রান এসেছে আজ পৃথিবীর বনে; 
সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে 
হেমন্ত এসেছে তবু; বললে সে, ‘ঘাসের ওপরে সব বিছানো পাতার 
মুখে এই নিস্তব্ধতা কেমন যে-সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার 
ছড়িয়ে পড়েছে জলে; কিছুক্ষণ অঘ্রাণের অস্পষ্ট জগতে 
হাঁটলাম, চিল উড়ে চলে গেছে-কুয়াশার প্রান্তরের পথে 
দু-একটা সজারুর আসা-যাওয়া; উচ্ছল কলার ঝড়ে উড়ে চুপে সন্ধ্যার বাতাসে 
লক্ষ্মীপেঁচা হিজলের ফাঁক দিয়ে বাবলার আঁধার গলিতে নেমে আসে; 
আমাদের জীবনের অনেক অতীত ব্যাপ্তি আজো যেন লেগে আছে বহতা পাখায় 
ঐ সব পাখিদের ঐ সব দূর দূর ধানক্ষেতে, ছাতকুড়োমাখা ক্লান্ত জামের শাখায়; 
নীলচে ঘাসের ফুলে ফড়িঙের হৃদয়ের মতো নীরবতা 
ছড়িয়ে রয়েছে এই প্রান্তরে বুকে আজ …… হেঁটে চলি….. আজ কোনো কথা 
নেই আর আমাদের; মাঠের কিনারে ঢের ঝরা ঝাউফল 
পড়ে আছে; খড়কুটো উড়ে এসে লেগে আছে শড়ির ভিতরে, 
সজনে পাতার গুঁড়ি চুলে বেঁধে গিয়ে নড়ে-চড়ে; 
পতঙ্গ পালক্‌ জল-চারি দিকে সূর্যের উজ্জ্বলতা নাশ; 
আলোয়ার মতো ওই ধানগুলো নড়ে শূন্যে কী রকম অবাধ আকাশ 
হয়ে যায়; সময়ও অপার-তাকে প্রেম আশা চেতনার কণা 
ধরে আছে বলে সে-ও সনাতন;-কিন্তু এই ব্যর্থ ধারণা 
সরিয়ে মেয়েটি তাঁর আঁচলের চোরাকাঁটা বেছে 
প্রান্তর নক্ষত্র নদী আকাশের থেকে সরে গেছে 
যেই স্পষ্ট নির্লিপ্তিতে-তাই-ই ঠিক;-ওখানে সিগ্ধ হয় সব। 
অপ্রেমে বা প্রেমে নয়- নিখিলের বৃক্ষ নিজ বিকাশে নীরব।